উত্তরা নিউজ উত্তরা নিউজ
অনলাইন রিপোর্ট


“ছেলেধরা আতঙ্ক” সত্যি নাকি গুজব?






মেহেদী হাসান অর্নব-

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম একটি সমস্যা হলো গুজব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহজলভ্যতায় এ গুজব দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পরে দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। এমনই একটি নয়া গুজব হলো ছেলেধরা বা কল্লাকাটা! বলা হয়ে থাকে পদ্মা সেতু করতে নাকি ২০ হাজার “কল্লা” প্রয়োজন!! তাই একদল লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে কল্লা সংগ্রহের জন্য!!! ভাবতেই অবাক লাগে এসব আজগুবি গল্প ছোটবেলায় নানু দাদুরা আমাদের শুনিয়ে ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়াতেন। আর ডিজিটালাইজেশন এর এই যুগে এসে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশের জনগণ এমন লোক কাহিনী কে সত্য হিসেবে ধরে নিয়েছেন।

আজ গুজবের ফলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামের পর গ্রাম শহরের পর শহর। খোদ রাজধাণীতেও এই গুজবের বলি হয়ে প্রাণ দিয়েছেন এক মহিলা। ছেলেধরা বা কল্লাকাটা গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছেলেধরা সন্দেহে বেশ কিছু লোককে পিটিয়ে মারা হয়েছে। এরমধ্যে নেত্রকোনার এক যুবকের ব্যাগে একটি বাচ্চার কাটা মাথাও যায়। এবং স্থানীয় জনতা গনপিটুনি দিয়ে ঐ যুবককেও হত্যা করে। এর ফলে এই কল্লাকাটা গুজব আরো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সাধারণ জনতা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কিন্ত সেখনকার পুলিশ প্রশাসনের সাথে কথা বলে এবং খোঁজ নিয়ে জানা গেছে – যে বাচ্চাটির মাথা কাটা হয়েছে সে ও যে কেটেছে তাদের উভয়ের বাড়িই একই এলাকায়। হতে পারে অন্য কোন বিরোধের জের ধরে এই যুবক হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে। কিন্ত শুরুতেই এটি “কল্লাকাটা ” বলে চাউর হওয়ায় সকলেই বিশ্বাস করতে থাকে যে বাস্তবেই পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে! দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছেলেধরা সন্দেহে যাদের গণপিটুনি দিয়ে মারা হয়েছে তাদের নিয়ে তদন্তে জানা গেছে তাদের বেশীরভাগই মানসিক ভারসাম্যহীন রোগী। আবার একদম নিরীহ মানুষও মারা গেছেন গনপিটুনিতে- রাজধানীর বাড্ডায় এক স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা তার বাচ্চাদের ভর্তি করার জন্য একটি স্কুলে খোঁজ নিতে গেলে স্থানীয় জনতা তাকে ছেলেধরা সন্দেহে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। অথচ ঐ মহিলার অনেক আত্মীয় স্বজনই ঢাকায় থাকেন। মূলত তারাই ঐ মহিলার লাশ সনাক্ত করেন। এর আগে কুমিল্লায় এক যুবককে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তার ব্যাগে দা, কাচি,ও রশি পাওয়া যায়। কিন্ত মূলত সে গ্রামের নারকেল গাছ পরিষ্কারের কাজ করতো। তার স্ত্রী ও এক সন্তান ছিলো। এভাবেই সাধারণ জনতার ভুল বোঝার শিকার হয়ে প্রাণ যাচ্ছে নিরীহদের। এমতাবস্থায় পুলিশ প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে, কাউকে পিটিয়ে মারা ফৌজদারি অপরাধ। কিন্ত আমার মনে হয় শুধু ঘোষণাতে কাজ হবে না। এক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন করার জন্য গ্রামে গ্রামে ছোটখাট কমিটি করে দেয়া যেতে পারে যারা সন্দেহভাজন এমন কাউকে পেলে পুলিশের হাতে সোপর্দ করবে। আর পুলিশেরও উচিত ছেলেধরা সন্দেহে আটক ব্যক্তির পরিচয় অনুসন্ধান করে সকলের সামনে প্রকাশ করা। এতে জনতার ভিতী কমবে এবং সচেতনতা বাড়বে। এবার আসি পদ্মা সেতুর প্রসঙ্গে- মূলত পদ্মাসেতুর কাজ একদমই শেষের দিকে। যে কেউই গিয়ে দেখে আসতে পারেন, কোন কাজই থেমে নেই৷ টেকনিক্যাল সবকিছু ঠিক ঠাক থাকলে নির্ধারিত সময়েই চালু হবে পদ্মা সেতু। বিদেশে এর চেয়েও কয়েকগুন বড় সেতু তৈরি হয়।

প্রশ্ন হলো – তাতে কি কল্লার দরকার হয় না??? আধুনিকতার এ যুগে এসেও যদি আমরা কুসংস্কার নিয়ে পড়ে থাকি তবে দেশ আগাবে না। সন্দেহজনক কাউকে ধরলে পিটিয়ে মেরে না ফেলে পুলিশে দিন। এদেশে ট্যাক্স দিয়ে বসবাস করেন, দেশের আইনের ওপর এতটুকু আস্থা কি নেই আপনার আমার? আর কোন নিরীহ মানুষের প্রাণ যেনো না যায় আপনার আমার ভুলে। ভুলে যাবেন না,বাঁচার অধিকার সবারই আছে।

লেখকঃ সাংবাদিক ও সংগঠক।