গণতন্ত্র থেকে কর্তৃত্ববাদের ঢেউ


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ১১ মার্চ ২০২০ - ০১:৩৮:৩১ অপরাহ্ন

গণতন্ত্র বিশ্বব্যাপী প্রচলিত একটি জনপ্রিয় শাসন ব্যবস্থার নাম। তবে, এখন ২০২০ সালে এসে প্রশ্ন উঠেছে এই শাসনব্যবস্থার বর্তমান জনপ্রিয়তা, অবস্থা ও বাস্তবতা নিয়ে। আধুনিক গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক মনে করা হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। কিন্তু, খোদ সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আজ গণতন্ত্র প্রশ্নের সম্মুখীন।

শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নয়, গণতন্ত্রের এই দুরাবস্থা আজকে সারাবিশ্ব জুড়েই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও নির্বাচিত নেতার সংখ্যা বাড়লেও সামগ্রিকভাবে কমেছে গণতন্ত্রের চর্চা। ১৯৭৪ সাল থেকে গণতন্ত্রের যে ঢেউ উঠেছিলো, যাকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন “গণতন্ত্রের তৃতীয় ঢেউ” বলে বর্ণনা করেছিলেন, তাতে এখন উল্টো যাত্রা শুরু হয়েছে। ১৮২৮ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত গণতন্ত্রের প্রথম ঢেউটি লেগেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ব্রিটেন, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, ইতালি এবং আর্জেন্টিনার মত দেশগুলোয়। প্রসার ঘটেছিল গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার।

গণতন্ত্রের দ্বিতীয় ঢেউটি লেগেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে। হান্টিংটন দেখিয়েছেন গণতন্ত্রের তৃতীয় ঢেউটি লেগেছিল ১৯৭৪ সালে যখন “ কেমেশন বিপ্লবের” সূত্রপাত হয়েছিল পর্তুগালে। ১৯৮৩ সালের পর গণতন্ত্র ছড়িয়ে পড়েছিল ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ল্যাটিন আমেরিকায়। সোভিয়ত ইউনিয়নের পতনের পর গণতন্ত্রের এই যাত্রা অব্যাহত থাকলো সারাবিশ্বে। তবে, আজকে আমরা ২০২০ সালে এসে দেখতে পাচ্ছি গণতন্ত্রের এই জোয়ারে ভাটার টান পড়তে শুরু করেছে। দিন দিন গণতন্ত্র তার গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে।

এজন্য সুইডেন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউটের (ভি-ডেম) গবেষকেরা বলছেন যে, এখন গণতন্ত্রের না “কর্তৃত্ববাদের তৃতীয় ঢেউ” শুরু হয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী। কর্তৃত্ববাদের প্রথম ঢেউটি শুরু হয়েছিল ১৯২২ থেকে ১৯৪২ সালে এবং দ্বিতীয় ঢেউটি লেগেছিল ১৯৫৮ থেকে ১৯৭৫ সালে। বর্তমান সময়ে চলমান রয়েছে কর্তৃত্ববাদের এই তৃতীয় ঢেউটি। ভি-ডেমের প্রতিবেদনের একটি সূচকে দেখা গেছে, ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ১৭৯ দেশের মধ্যে ১৫৮ টি সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অবস্থার উন্নতি হয়নি অবনতি ঘটেছে। ওই দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ব্রাজিলসহ ২৪টি দেশ রয়েছে , যাদের গণতন্ত্র চর্চায় অবনতি ঘটেছে।

আরো ভালোভাবে বলতে গেলে এই দেশগুলো কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঝুঁকছে। এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বিশ্বে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করছে। কর্তৃত্ববাদের প্রসার ঘটেছে বৃহৎ জনসংখ্যার নরেন্দ্র মোদীর দেশ ভারতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল ও ভেনেজুয়েলায়। এই সকল দেশগুলোতে গণতন্ত্র হারিয়ে কর্তৃত্ববাদের প্রসারের কারণ হচ্ছে মূলত সরকার কর্তৃক গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, সুশীল সমাজের ভূমিকা কমে যাচ্ছে, বির্তকিত নির্বাচন পদ্ধতি ও আইনের শাসনের অভাবে।

বিশ্বের যে ২৪টি দেশে গণতন্ত্র এখন ঝুঁকির মুখে সেগুলোর প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে, এই দেশগুলোতে ভিন্নমতের জায়গা সীমিত হয়ে পড়েছে, সরকারের বিরোধীদের প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষাকবচ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা টিকে থাকলেও তা খুবই সীমিত পরিসরে। গণতন্ত্রের পরিবর্তে যে দেশগুলোকে কর্তৃত্ববাদের ঢেউ লেগেছে সেগুলোর ক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত তাদেরকে লোকরঞ্জনবাদী বা পপুলিস্ট নেতাই বলা যায়। এই লোকরঞ্জনবাদী নেতারা মানুষের আবেগকে পুঁজি করে ক্ষমতায় আসেন, জটিল সমস্যার সহজ সমাধানের কথা বলে ক্ষমতায় আসেন কিন্তু, সময় যত গড়ায় লোকরঞ্জনবাদী শাসকরা তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে কর্তৃত্ববাদে ঝুঁকে পড়ছে।

সারাবিশ্বে গণতন্ত্র আজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে থাকলেও কিছু আশার কথা এখনও শোনা যাচ্ছে গণতন্ত্রের জন্য। গণতন্ত্র এখন চর্চা হচ্ছে বিশ্বের ৯৯টি দেশে যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে ৫৫%। বিশ্বের ২১টি দেশে গণতন্ত্র উন্নয়ন করেছে যাদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে আর্মেনিয়া, বুরকিনো ফার্সো, জর্জিয়া, কিরগিস্তান, তিউনিশিয়া, গাম্বিয়া, ফিজি। গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন চলমান রয়েছে হংকং, লেবানন, ইরাক ও ইরানে। তবে, আমরা গণতন্ত্রের জন্য আশার কথাগুলোই শুনতে চাই। গণতন্ত্রকে বিকাশমান রাখতে জনগণের মতের অধিকার, ভোটের অধিকার, আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কর্তৃত্ববাদী ও লোকরঞ্জনবাদীদের পতন ত্বরান্বিত করতে হবে।

লোকরঞ্জনবাদী যারা কিনা জাতীয়তাবাদের আড়ালে বিদেশীভীতি বা জেনোফোবিয়া এবং ইসলামভীতি বা ইসলামোফোবিয়াকে পুঁজি করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। মোটা দাগে একথা বলা যায় যে, গণতন্ত্র যেহেতু জনগণের শাসন ব্যবস্থা সেহেতু গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য জনগণকেই জেগে উঠতে হবে। তবে, আমরা যারা আশাবাদীদের দলে তারা বলতেই পারি যেসকল দেশে “হাইব্রিড রেজিম” বা দো আশঁলা শাসন সহজ কথায় না গণতান্ত্রিক না কর্তৃত্ববাদী শাসন বর্তমান সেখানের জনগণেরা তাদের অধিকার সচেতন হয়ে উঠবে, গণতন্ত্রের জয় সুনিশ্চিত করবে।

কর্তৃত্ববাদের এই তৃতীয় ঢেউ না থামা গেলে বিশ্বব্যাপী চলমান সংঘাতগুলো যেমন বাড়বে তেমনিভাবে বাড়বে জনগণের অনাস্থা। সমাজও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও স্থায়িত্বের জন্য কর্তৃত্ববাদের ঢেউকে রুখতে হবে, জাগতে হবে।