মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান
উত্তরা নিউজ, স্টাফ রিপোর্টার


কালীগঞ্জের জোড়বাংলা মসজিদ

ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের পশ্চিম পাশে বারোবাজার




কালীগঞ্জর বারোবাজার মৌজায় জোড় বাংলা মসজিদটি অবস্থিত। ১৯৯২-৯৩ সালে প্রতœতত্ব বিভাগ কর্তৃক খননের ফলে আবিষ্কৃত হয়েছে এক গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি। মসজিদের পাশে রয়েছে কয়েকটি কবর। ছোট ছোট সুন্দর পাতলা ইটে গাঁথা এ মসজিদটি ১০/১১ ফুট উচুঁ প্লাট ফর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত।

মসজিদে প্রবেশের পথটি উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত। এ প্রবেশ পথ থেকে দীঘি পর্যন্ত ইটের তৈরী বিশাল সিঁড়ি নেমে গেছে। বর্গাকৃতি এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি পুনঃ নির্মিত হয়েছে। এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন এলাকার মানুস। পশ্চিম দেয়ালে অর্ধবৃত্তাকারে পোড়ামাটির নক্সা ও অলংকরণে ৩টি মেহেরাব আছে। চুন বালির প্লাস্টারের কাজও লক্ষ্য করা যায়। মেহেরাবের দুই পাশেই ছোট পিলার আছে। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি ফুল ও লতাপাতা অংকিত ইটের তৈরী। স্থাপত্য শিল্পের সৌন্দর্য ও কারুকার্যময় এ দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি মুসলিম সভ্যতা ও উৎতর্ষের নিদর্শন।

সম্ভবত ৮০০ হিজরীতে শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে নুসাই মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। সাদিকপুর মসজিদ, খান জাহান আলী (রাঃ) মাজার সংলগ্ন মসজিদ, ডুমুরিয়ার সারসনগর মসজিদ, অভয়নগরের শুভারাদা মসজিদ এবং বাগেরহাট বিবি কেরানী মসজিদর নির্মাণ শৈলীর সাথে এ মসজিদের সাদৃশ্য আছে। জোড়বাংলা মসজিদের উত্তরের পুকুরটি অন্ধপুকুর নামে পরিচিত এলাকার সবার কাছে। সুলতান মাহমুদ শাহের শাসনামলে মুসল্লীদের ওযু ও পানীয় জলের প্রয়োজনের কারণে এ পুকুর খনন করা হয়েছিল। মসজিদের উত্তর-পূর্বের প্রবেশ দ্বার থেকে অন্ধপুকুরের তলদেশ পর্যন্ত ইট বাঁধান সিঁড়ির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

গলাকাটা মসজিদ থেকে কয়েকশ গজের মধ্যেই জোড়বাংলা মসজিদের অবস্থান। জোড়বাংলা নামকরণ সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য নেই। তবে প্রচলিত লোককথা মতে ঐ স্থানে একটা জোড়া কুড়ে ঘর ছিল। সে কারনেই এর নাম করন করা হয় জোড়বাংলা। আবার কারো কারো মতে এখানে জোড়া দিঘি ছিল। যার কারণে জোড়বাংলা নামকরণ হয়েছে। ১৯৯২ সালে প্রতœতত্ব বিভাগ খুলনা, মসজিদটির খনন কাজ সম্পন্ন করে। বর্গাকৃতির মসজিদটির প্রবেশপথ উত্তর-পূর্ব পার্শ্বে। উত্তরপার্শ্বের প্রবেশপথ থেকে পার্শ্ববর্তি দিঘির ঘাট পর্যন্ত ইটের রাস্তার সন্ধান মেলে। মুসল্লীদের অযু করার জন্য এই ঘাটটি ব্যবহৃত হতো। সম্প্রতি তৈরি একটি পাকা রাস্তা, ঘাট ও মসজিদটিকে আলাদা করে ফেলেছে। এই এলাকা হতে একটি শিলালিপির কয়েকটি ভগ্নাংশ আবিষ্কৃত হয়। শিলালিপি থেকে সঠিক তথ্য উদঘাটন করা না গেলেও অনুমান করা হয় যে, আলাউদ্দিন হুসাইন শাহের পুত্র সুলতান গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনকালে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। খননকালে কোন গম্বুজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বর্তমানে একটি গম্বুজসহ মসজিদটি পুণঃনির্মিত হয়েছে। কেবলা দেওয়ালে রয়েছে তিনটি অর্ধবৃত্তআকৃতির মেহরাব। যদিও একদা জির্ণ অবস্থায় ছিল তাদের ভেতর দিকে প্যানেল ও বাধন দ্বারা সুসজ্জিত। মেহরাবের দু পাশে দেয়ালের সঙ্গে সংযুক্ত ছোট পিলার অবস্থিত এবং আয়তাকার ফ্রেম দ্বারা প্রান্তসীমা বাধানো।ভিতর থেকে উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়ালের প্রতিটিতে দুটি করে মসজিদের দেওয়ালে চারটি ছোট কুলঙ্গি আছে।যা দেখতে খুবই সুন্দর।দুরদুরান্ত থেকে অনেক মানুষ মসজিদ টি দেখতে আসেন। কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার একটি প্রাচীন জনপদ। এটাকে অনেকে বারো আউলিয়ার শহর বলে থাকেন। ইসলাম প্রচারের জন্য বারো আউলিয়া এসেছিলেন এই জনপদে। প্রায় তিন বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখানে আছে পুরানো শহর মোহম্মদাবাদ।১৯৯৩ সালে এখানকার মাটি খুড়ে সন্ধান মেলে ১৫ টিরও বেশি মসজিদ। এগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই প্রাচীন শহর মোহাম্মদা বাদের পুরানো ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, প্রাচীন কালে বারোবাজারের নাম ছিল ছাপাইনগর।এ নগর ছিল হিন্দু আর বৌদ্ধ শাসকদের রাজধানী। বারো আউলিয়া আসার আগে বৈরাট নগরের বাদশা শাহ সিকান্দার তার সংসর ত্যাগী সন্তানদের কর্মকা- ছিল এই জনপদে। পরবর্তীতে বারোজন সহচর নিয়ে হযরত খাজা খানজাহান আলী (রঃ) এখানে আসেন। সেখান থেকেই এর নাম হয় বারোবাজার।যুদ্ধ কিংবা মহামারিতে ছাপাইনগর ধ্বংস হয়ে যায়। থেকে যায় প্রাচীন ইতিহাস। বারোবাজারের মসজিদ গুলোর সঙ্গে বাগেরহাটের কয়েকটি মসজিদের বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের পশ্চিম পাশে বারোবাজার। মহাসড়ক ছেড়ে তাহেরপুর সড়ক ধরে পশ্চিম দিকে যেতে রেল লাইন পেরিয়ে হাতের ডানে শুরুতেই পাওয়া যাবে এক গম্বুজ বিশিষ্ট পাঠাগার মসজিদ। বারোবাজারের সবচেয়ে বড় সাতগাছিয়া আদিনা মসজিদ।৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া এ মসজিদটির ভেতরে এখনো দেখা যায় ৪৮ টি পিলার। লাল ইটের তৈরি এই মসজিদ আকারে ছোট। দীর্ঘদিন মাটি চাপা পড়ে থাকার পর ২০০৭ সালে প্রতœতত্ব অধিদপ্তর মসজিদটি সংস্কার করে।জনশ্রুতি আছে সুলতানী আমলে নির্মিত এই মসজিদ কেন্দ্রীক একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার ছিল। মসজিদের পাশেই বড় আকারের একটি দিঘি, নাম পিঠেগড়া পুকুর। আবারও তাহেরপুর সড়ক ধরে সামনে এগুতে হবে। দুটি বাঁক ঘুরলেই বিশাল দিঘি, নাম পীর পুকুর। পশ্চিম পাড়ের মাঝ বরাবর বেশ বড় আকৃতির মসজিদ পীর পুকুর মসজিদ। এই মসজিদও ছিল মাটির নিচে।

১৯৯৪ সালে খনন করে বের করা হয়েছে। এই মসজিদে ছাঁদ নেই, শুধু দেয়াল আছে। মসজিদটি লাল ইটের তৈরি। তাহেরপুর সড়ক ধরে সামান্য পশ্চিম দিকে এগুলে হাতের বাঁয়ে একটু ভেতরের দিকে আরেকটি মসজিদের দেখা মিলবে। এর নাম গোড়া মসজিদ। এই মসজিদ চার গম্বুজ বিশিষ্ট।মসজিদের মিহরাব ও দেয়ালে পোড়ামাটির ফুল, লতাপাতা ফলের নকশাসহ নানান কারুকার্য মন্ডিত। বাইরের দেয়ালও লাল ইটে মোড়ানো। ১৯৮৩ সালে এই মসজিদের সন্ধান পায় প্রতœতত্ব অধিদপ্তর। এর পূর্ব পাশেও বড় আকৃতির একটি দিঘি আছে।মসজিদটি খননের সময় একটি কবরের সন্ধান মেলে। জনশ্রুত আছে কবরটি গোড়াই নামে কোন এক দরবেশের। এ থেকেই এর নাম গোড়ার মসজিদ। গোড়ার মসজিদ থেকে আবারও তাহেরপুর সড়কে সামনের দিকে চলতে হবে। সামান্য গেলে সড়কটির উত্তর পাশে আরও একটি মসজিদ।চার গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের নাম শুনলে ভয় লাগাটাই স্বাভাবিক। নাম ‘গলাকাটা মসজিদ’। প্রায় ২১ ফুট লম্বা ও ১৮ ফুট চওড়া এই মসজিদ খনন করা হয় তোলা হয় ১৯৯৪ সালে। ছয় গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব আছে। এর দেয়াল গুলো প্রায় পাঁচ ফুট চওড়া। মাঝখানে আছে লম্বা দুটি কালো পাথর।

১৯৯৪ সালে মসজিদের পাশেই পুরো এলাকায় তথা শহর মোহাম্মদাবাদের প্রতœতত্ব নিদর্শন গুলোর নির্দেশনা সম্বলিত হাতে আঁকা একটি মানচিত্র। জনশ্রুতি আছে, বারোবাজারে এক অত্যাচারী রাজা ছিল। প্রজাদের বলি দিয়ে ওই দিঘির মধ্যে ফেলে দিত সে। এ কারণেই এর নাম হয় গলাকাটা। গলাকাটা মসজিদের সামনে শহর মোহাম্মদাবাদের মানচিত্র। বারোবাজারের সবগুলো প্রতœততের¡ নির্দেশনা আছে এতে।গলাকাটা মসজিদ থেকে সামান্য পশ্চিম পাশে, সড়কের বিপরীত দিকে আরেকটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। নাম জোড় বাংলা। মসজিদটি খনন করা হয় ১৯৯৩ সালে।খননের সময় এখানে একটি ইট পাওয়া যায়, তাতে আরবি অক্ষরে লেখা ছিল, ‘শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে হুসাইন, আটশো হিজরী’। জনশ্রুত আছে মসজিদের পাশে জোড়া কুঁড়েঘর ছিল বলেই এর নাম জোড় বাংলা মসজিদ।এবার পাশের সড়ক ধরে আরও কিছু দূরে এগুলে সাতগাছিয়া আদিনা মসজিদের সাইন বোর্ড চোখে পড়বে। পাকা সড়ক ছেড়ে হাতের ডানে মেঠোপথে সামান্য সামনের দিকে চলতে হবে। এখানেও বড় একটি পুকুরের দক্ষিণ পাশে সাতগাছিয়া আদিনা মসজিদের ধ্বংসাবশেষ।এটির শুধু দেয়াল আর নিচের অংশই অবশিষ্ট আছে। স্থানীয়দের মতে সর্ব প্রথম গ্রামের লোকজনই মাটিচাপা পড়ে থাকা এই মসজিদ উদ্ধার করে। আকারে এ এলাকার সবচেয়ে বড় মসজিদ এটি। প্রায় ৭৭ ফুট লম্বা ও ৫৫ ফুট চওড়া মসজিদের ভেতরে আছে ৪৮টি পিলার। পশ্চিম দেয়ালে লতা-পাতার নকশা সমৃদ্ধ তিনটি মিহরাব আছে।সাতগাছিয়া মসজিদ থেকে এবার চলে আসা যাক পেছনের দিকে। বারোবাজার রেল লাইনের পশ্চিম দিকে বিশাল এক দিঘির পশ্চিম পাড় ধরে একটি সড়ক চলে গেছে হাসিলবাগ গ্রামে। এখানেও একটি বড় দিঘির পশ্চিম পাশে রয়েছে এক গম্বুজ বিশিষ্ট নুনগোলা মসজিদ। বর্গাকৃতির এ মসজিদে তিনটি অর্ধ বৃত্তকার মিহরাব আছে।এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ এটি। স্থানীয়রা একে লবণগোলা মসজিদও বলে থাকেন। তবে এ নামকরণের কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। নুনগোলা মসজিদের সামান্য পশ্চিমে হাসিলবাগ গ্রামে আরও একটি এক গম্বুজ মসজিদ আছে।

হাসিলবাগ মসজিদ নামে পরিচিত এ মসজিদের মূল নাম শুকুর মল্লিক মসজিদ। পোড়া মাটির তৈরি মসজিদটি এ অঞ্চলের সবচেয়ে ছোট এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। এসব স্থাপনাগুলো ছাড়াও বারোবাজারে আছে আরও কিছু প্রসিদ্ধ স্থান।সবের মধ্যে উল্লেখযাগ্য হল ঘোপের ঢিবি কবরস্থান, নামাজগাহ কবরস্থান, জাহাজঘাটা, মনোহর মসজিদ, দমদম প্রত্নতত্ব, বাদেডিহি কবরস্থান, খড়ের দিঘি কবরস্থান।