করোনা মহামারি মোকাবেলা এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধার


» উত্তরা নিউজ | অনলাইন রিপোর্ট | সর্বশেষ আপডেট: ০৮ মে ২০২০ - ১১:২৬:৫১ পূর্বাহ্ন

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারি যেমন একদিকে হাজার হাজার প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে এর প্রভাবে অর্থনৈতিক স্থবিরতাও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে। করোনা দুর্যোগ শুরুর আগে থেকেই শ্লথ হয়ে পড়া আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নিয়ে সবাই ভাবিত ছিলেন। আর মহামারির কারণে অর্থনীতি এখন সুনিশ্চিত মন্দার পথে। অনেকে এমনও আশঙ্কা করছেন যে এটি স্মরণকালের ভয়াবহতম মন্দা হতে যাচ্ছে। শুরু থেকেই লিখে ও বলে আসছি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হলে করোনার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে যতটা নেতিবাচক হবে, বাংলাদেশের জন্য ততটা হবে না। এই আশাবাদের পেছনে মূলত কাজ করেছে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা যে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করেছি সেগুলোর ওপর বিশ্বাস। আমি এখনো বিশ্বাস করি, কৃষি এবং এসএমই খাতকে যথাযথ প্রণোদনা দেওয়া গেলে এবং ওই প্রণোদনাগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে এ বছর আমাদের প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেকটাই বেশি হওয়া খুবই সম্ভব। সর্বশেষ ইকোনমিস্ট সাময়িকীর প্রতিবেদনেও একই ধরনের আশার কথা শোনা গেছে। জিডিপির শতাংশ হিসেবে জনগণের ঋণ, বৈদেশিক ঋণ, ঋণের সুদ এবং বৈদেশিক দায় শোধের সক্ষমতা—এই সূচকগুলোর আলোকে ৬৬টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের যে র্যাংকিং সাময়িকীটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। বাংলাদেশের রিজার্ভ সন্তোষজনক থাকায় এ সূচকগুলো ভালো পর্যায়ে রয়েছে। দেখা যাচ্ছে এ সময়ে ভারত, চীন, এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের চেয়েও বাংলাদেশের অর্থনীতি তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থাকার পেছনে মূলত কাজ করেছে যে বিষয়টি, তা হলো এখনো আমাদের অর্থনীতি বহুলাংশে কৃষিনির্ভর এবং ধারাবাহিকভাবে আমরা সামাজিক পিরামিডের পাটাতনে থাকা মানুষদের হাতে টাকা পাঠানো অব্যাহত রেখেছি। অর্থাৎ বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল শুধু মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে যায়নি; বরং সরকার তার অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির মাধ্যমে এর সুফল পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছেও। এই ধারাবাহিকতার শুরু এক দশকেরও বেশি সময় আগে, সর্বশেষ বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা চলাকালীন বা তার ঠিক পর পর। ওই সময়েই আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে ব্যাপকভিত্তিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এক জাতীয় অভিযান শুরু করেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল ‘রিয়েল ইকোনমি’তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা, স্থানীয় বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি রিজার্ভের আকার বৃদ্ধি। এই নীতির মাধ্যমে সর্বশেষ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা শুধু কার্যকরভাবে মোকাবেলাই করা হয়নি, পাশাপাশি অর্থনীতির চাকাকেও আগের তুলনায় বহুলাংশে গতিশীল করা সম্ভব হয়েছিল। ব্যাপকভিত্তিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতির ‘রেজিলিয়েন্স’ বাড়ানো সম্ভব হয়েছিল বলেই এখন এই করোনাজনিত অর্থনৈতিক স্থবিরতার মধ্যেও আশার আলো দেখতে পাচ্ছে বাংলাদেশ। এবারও বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে, ধান কাটাও চলছে। চেষ্টা করতে হবে এই ধান যেন মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে সংগ্রহ করা যায়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনকে আস্থায় নিতে হবে।

তবে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে সবার আগে মানুষকে বাঁচাতে হবে। মানুষ বাঁচলে তবেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক শক্তি আমাদের কাজে আসবে। করোনা দুর্যোগের ফলে রোগাক্রান্ত হয়ে যাতে মানুষ মারা না যায়, আবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একরকম বন্ধ থাকায় না খেতে পেয়েও যাতে কেউ কষ্ট না করে, এগুলো নিশ্চিত করাই এখন আমাদের প্রধান কাজ। দীর্ঘদিন ধরে আমরা স্বাস্থ্য খাতকে অবহেলা করে এসেছি। করোনা মহামারির ফলে এই অবহেলাজনিত দুর্বলতাগুলো আমাদের সামনে প্রকট হয়ে ধরা পড়েছে, এখনো পড়ছে। স্বাস্থ্য অবকাঠামোর অপর্যাপ্ততার ফলে দুর্যোগের ভয়াবহতা ও ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে বাংলাদেশের জন্য। শুরু থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব না হলেও আমরা মনে হয় এখন ঠিক পথে ফিরতে শুরু করেছি। প্রথমদিকে করোনা পরীক্ষার যে অপর্যাপ্ততা ছিল তা আমরা কাটিয়ে উঠছি। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থায় যে ত্রুটিগুলো ছিল সেগুলো কাটিয়ে উঠার চেষ্টা সত্ত্বেও আরো সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। হঠাৎ করে গার্মেন্ট খুলে দেওয়ায় শ্রমিকসহ সবার স্বাস্থ্য ঝুঁকি হয়তো বেড়েছে। তাই এ দিকটায় সংশ্লিষ্টদের কড়া নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে তাদের থাকা ও খাওয়ার পরিবেশ সর্বক্ষণ মনিটর করতে হবে। তবে স্বাস্থ্য খাতের এই সংকট রাতারাতি সমাধান হওয়ার নয়। পুরো স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। এতে সময় ও সম্পদ লাগবে সন্দেহ নেই। তবে সে জন্য এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে।

জনগণকে করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি করোনা ঠেকাতে গিয়ে অর্থনীতির গতি কমিয়ে আনার ফলে নাগরিকরা (বিশেষত কম আয় করেন এমন মানুষ এবং যাঁরা অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত) স্বল্প মেয়াদে তো বটেই মধ্যম থেকে দীর্ঘ মেয়াদেও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়েছেন। এই ঝুঁকি থেকেও তাঁদের রক্ষা করতে হবে। আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক শক্তি বা ‘ম্যাক্রো-ইকোনমিক রেজিলিয়েন্স’ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে নিঃসন্দেহে। তবে উল্লিখিত নাগরিকদের দোরগোড়ায় সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নিতে হবে আগে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে অর্থনীতিকে রক্ষার জন্য বেশ কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এগুলো সময়োচিত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকও বটে। কারণ বৃহৎ এবং রপ্তানিমুখী খাতগুলোর পাশাপাশি এসএমই ও কৃষি খাতের জন্যও প্রণোদনার ঘোষণা এসেছে। প্রধানত সহজ শর্তে ঋণভিত্তিক এসব প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে এরই মধ্যেই কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ব্যাংকগুলো তাদের পুরনো গ্রাহক ছাড়া নতুনদের জন্য খুব বেশি কিছু করবে বলে মনে হয় না। কেন না, নতুনদের কোনো ‘ক্রেডিট রেকর্ড’ ব্যাংকগুলোর কাছে নেই বলে তারা বাড়তি ঝুঁকি নিতে চাইবে না। সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকারকে এরই মধ্যে ছোট আকারে চালু থাকা ‘ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম’টিকে বহু গুণে সম্প্রসারিত করতে হবে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উদ্ভাবনী কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় এসব কর্মসূচিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোকেও যুক্ত করেছে। খাতভিত্তিক এসব ঋণ কর্মসূচি অর্থনীতির চাকাকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় গতিশীল করবে বলেই মনে করছেন গবেষক-বিশ্লেষকরা। কিন্তু এগুলোর ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চিত করতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এই প্রেক্ষাপটেই সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপকভিত্তিক ত্রাণ তৎপরতা চালানো হচ্ছে, ওএমএস কর্মসূচি বেগবান করা হয়েছে, ঘোষণা এসেছে নতুন করে রেশন সুবিধা চালু করার।

খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে ঠিকই, তবে প্রথাগত ‘ফুড অ্যাসিসটেন্স’ এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে না। কারণ আমাদের কার্যকরভাবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছাতে হবে। অথচ ব্যাপকভিত্তিক রেশন কর্মসূচি চালু করতে সংগত কারণেই একটু সময় লাগবে। এ অবস্থায় ‘আউট অফ দ্য বক্স’ চিন্তাভাবনা করতে হবে। নতুন নতুন কৌশল প্রয়োগ করতে হবে পাইলট ভিত্তিতে। যেগুলো সফল হবে সেগুলো আরো ব্যাপক আকারে প্রয়োগের উদ্যোগ নিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় পাবনার ঈশ্বরদীর কৃষক ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগের কথা। সেখানে চলমান লকডাউনে সবজি উৎপাদনকারীদের ফসল চালান দিতে না পারায় নষ্ট হচ্ছিল। স্থানীয় প্রশাসন ওই সবজি তুলনামূলক কম মূল্যে হলেও উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে অভাবী মানুষের মাঝে বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। একই রকম উদ্যোগ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও নেওয়া যেতে পারে।

খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম ব্যাপক ভিত্তিতে চালানোর কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই মনে করেন খাদ্য সহায়তা কার্যক্রমে ‘লিকেজ’ বেশি হবে। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে খাদ্য সহায়তাসহ আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম অতীতের তুলনায় এখন বহু গুণে স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক হয়েছে। শুরুতেই কিছু দুর্নীতিবাজ স্থানীয় প্রতিনিধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় এই পরিবেশ বেশ খানিকটা উন্নত হয়েছে।

মানুষের দোরগোড়ায় খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া খুবই জরুরি। তবে এটাও ঠিক যে কার্যকরভাবে বিশাল আকারের খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম চালু করতে যে সময় দরকার তা আমাদের হাতে নেই। আর এ ছাড়াও আমরা জানি যে সারা দেশেই দোকানপাট ও বাজার সীমিত মাত্রায় হলেও চালু আছে। করোনা পরিস্থিতির আরো অবনতি না হলে হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজার-ঘাট আরো বেশি মাত্রায় খোলা থাকবে। অর্থাৎ নিম্ন আয়ের মানুষের সামনে এখনো হয়তো কিছু মাত্রায় হলেও বাজারে গিয়ে সদাই কেনার সুযোগ রয়েছে। মহামারি আরো দীর্ঘায়িত না হলে এ সুযোগ আরো বাড়বে। তাই খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির সমান্তরালে নগদ সহায়তা কর্মসূচিও চালু করা যেতে পারে। মানুষের হাতে নগদ টাকা থাকলে তারা বাজারে গিয়ে চাহিদামতো পণ্য কিনবে। তবে এ জন্য পরিবহন ব্যবস্থাকেও একটি মাত্রায় চালু রাখতে হবে, যাতে করে এক অঞ্চলে উৎপাদিত নিত্য পণ্য অন্য অঞ্চলে যেতে পারে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মতো করোনা হটস্পটগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনে এসব অঞ্চলে লকডাউন ও সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং আরো জোরদার করতে হবে।

নগদ সহায়তা কার্যক্রমের মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি সুফলও আমাদের বিবেচনা করতে হবে। যেমন : খাদ্য সহায়তা পরিবারগুলোর বর্তমান চাহিদা মেটাবে ঠিকই, কিন্তু প্রান্তিক কৃষকরা হাতে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে পরবর্তী মৌসুমে চাষের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনতে পারবে না। কাজেই ক্ষুদ্র কৃষকদের নগদ সহায়তা দেওয়া গেলে তা মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণেও রাখবে কার্যকর ভূমিকা। তবে নগদ সহায়তা কার্যক্রমকে খাদ্য সহায়তার বিকল্প হিসেবে নয়; বরং সমান্তরাল কর্মসূচি হিসেবে ভাবতে হবে। এককভাবে কোনো একটি বেছে নিলে সংকট তৈরি হতে পারে। যেমন : মানুষের হাতে নগদ টাকা দেওয়ার পর বাজারে ভোগ্য পণ্যের সরবরাহ ঘাটতির অজুহাতে বিক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ওএমএস এবং রেশন কর্মসূচি একটি মাত্রায় চালু থাকলে এ রকম দাম বাড়ানোর সুযোগ সীমাবদ্ধ হবে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। আশার কথা এই যে সরকারের দিক থেকে ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে মাসে দুই হাজার ৪০০ টাকা করে নগদ সহায়তার উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে। আশা থাকবে খাদ্য ও নগদ সহায়তা সমান্তরালে চালানোর মাধ্যমেই সংকট মোকাবেলার চেষ্টা করবেন আমাদের নীতিনির্ধারকরা।

দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের হাতে নগদ অর্থ কার্যকরভাবে পৌঁছানোর বিষয়ে নীতিনির্ধারক মহলসহ অন্য অংশীজনরা আত্মবিশ্বাসী হতে পারছেন দেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসারের কারণেই। কয়েকটি মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্ল্যাটফর্ম এখন কার্যকরভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের ভোটার ডাটাবেইস ব্যবহার করে খুব সহজেই যে কেউ এমএফএস অ্যাকাউন্ট খুলে নিতে পারেন। আপৎকালে গার্মেন্ট কর্মীদের হাতে বেতন পৌঁছানোর জন্য এই প্ল্যাটফর্মগুলো এরই মধ্যেই ব্যবহার করতে শুরু করেছেন কারখানা মালিকরা। একইভাবে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর কাছে সরকারি নগদ সহায়তা পৌঁছানো যেতে পারে। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে বিশেষত কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর কাছে নগদ সহায়তা পৌঁছানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে খোলা ‘১০ টাকার অ্যাকাউন্ট’গুলোও ব্যবহার করা যেতে পারে।

এই অর্থবছর প্রায় শেষ। আসন্ন বাজেটে করোনাজনিত মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে সময়োপযোগী বরাদ্দ দেখা যাবে বলেই সবাই আশা করছে। এরই মধ্যে যে অগ্রাধিকারগুলো আলোচনা করেছি সেগুলো অনুসারে কাজ করতে অবশ্যই বিপুল সম্পদ দরকার হবে। বাজেট পুনর্বিন্যাস করে অদরকারি খাতগুলো থেকে অর্থ সরিয়ে করোনার প্রভাব মোকাবেলার সঙ্গে যুক্ত কর্মসূচি অর্থায়ন করা যেতে পারে। বিদ্যমান অবস্থায় কর আহরণ বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারের আয় বাড়ানোর বাস্তবতা নেই। কাজেই বাড়তি খরচের জন্য সরকারকে ঋণ করতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে অতিরিক্ত ঋণ না করাই ভালো। কারণ সরকার দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিলে ব্যক্তি খাতের ঋণ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হবে। সবচেয়ে ভালো হবে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবির মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ নিলে। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে আমাদের প্রমাণিত সামর্থ্যের কারণে এসব প্রতিষ্ঠান ঋণ প্রদানে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেবে বলেই মনে করি। তবে এসব অর্থ আমাদের হাতে আসতে খানিকটা সময় লাগবে। এই সময়টায় বাংলাদেশ ব্যাংক তার ব্যালান্সশিট সম্প্রসারণের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিস সামর্থ্যবান প্রবাসীদের কাছে অনলাইনে বিভিন্ন বন্ড বিক্রির উদ্যোগ নিতে পারে। এরই মধ্যেই এ প্রক্রিয়ায় ট্রেজারি বন্ড বিক্রি শুরু হয়েছে। একইভাবে ওয়েজ আর্নার্স বন্ডসহ অন্যান্য বিনিয়োগ বন্ড বিক্রির কার্যক্রম অনতিবিলম্বে শুরু করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, করোনার মতো প্রকট হুমকির মুখে আমরা স্মরণকালের মধ্যে পড়িনি। তাই অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি মাত্রায় পারস্পরিক সহযোগিতা এবং উদ্ভাবনী কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আমরা এ সংকট থেকে উত্তরিত হতে পারব।

লেখক :  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

dratiur@gmail.com