করোনা ভাইরাসে চীনে বন্ধ


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ - ০৮:৪৩:১৯ অপরাহ্ন

করোনা ভাইরাসের কারণে চীনে কাঁকড়া রপ্তানি বন্ধ রেখেছে সরকার। ভরমৌসুমে কাকড়া রপ্তানি বন্ধে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন বাগেরহাটের চাষীরা। সেই সাথে ব্যবসায়ি ও রপ্তানিকারকদেরও দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কারণ রপ্তানি বন্ধ থাকায় সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে তেমনি চাষী, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকরাও বিপুল পরিমান আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে কাকড়া চাষ বন্ধ ছাড়া কোন উপায় থাকবে না দাবি চাষীদের। আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য্য ধরার আহবান জানিয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ।

দক্ষিণাঞ্চলের বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় কাঁকড়ার চাষ হয়ে থাকে। বাগেরহাটে সাধারণত শিলা জাতের কাঁকড়ার চাষ হয়। কম জমি ও স্বল্প সময়ে কাকড়া চাষ করা যায়। চিংড়ির তুলনায় কাকড়ার রোগব্যাদিও কম। সব মিলিয়ে অন্যান্য মাছের থেকে কাঁকড়া চাষে ঝুঁকি কম হওয়ায় এক দশক ধরে বাগেরহাটে কয়েক হাজার কাঁকড়া চাষী সৃষ্টি হয়েছে। চাষ লাভজনক হওয়ায় দিনদিন চাষীও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাগেরহাটের সাত উপজেলায় এক হাজার ৫‘শ হেক্টর জমিতে ৩ হাজার ৭৭৮টি কাঁকড়ার খামার রয়েছে। গেল বছর ২ হাজার ৩২ মেট্রিক টন কাকড়া উৎপাদন হয়েছে এসব খামার থেকে। এ ছাড়া ৫‘শ ৯৭ মেট্রিক টন কাকড়া প্রাকৃতিক উৎস্য থেকে আহরণ করেছে জেলেরা। জেলায় উৎপাদিত এসব কাকড়ার ৮০ শতাংশ চীনে রপ্তানি করা হত। প্রতিবছর ১৫ই ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত কাকড়া সিংহভাগ কাকড়া রপ্তানি হত। কিন্তু চীনে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় ২৩ জানুয়ারি থেকে কাকড়া রপ্তানি বন্ধ রয়েছে চীনে। যার ফরে স্থানীয় ডিপো মালিকরা কাঁকড়া কেনা বন্ধ করে রেখেছে। এদিকে খামারে বড় হয়ে যাওয়া পূর্ণ বয়স্ক কাঁকড়া মরলেও দরতে পারছেনা চাষীরা। কারণ স্থানীয় বাজারে দামি কাকড়ার চাহিদা নেই বললেই চলে। তাই চোখের সামনে নিজের মূল্যবান সম্পদ মরলেও কিছুই করতে পারছেন না চাষীরা। এদিকে করোনা ভাইরাসের কারণে ২৩ তারিখের আগে ক্রয় করে রাখা কাকড়া ডিপুতে থেকে মরে পচলেও বিক্রি করতে পারছেন না ডিপো মালিকরা। রপ্তানিকারকরাও রয়েছে বিপদে।

কুন্তল ইজারাদার, পিনাক মজুমদার, আবদুল আজিজসহ রামপাল উপজেলার কয়েকজন কাকড়া চাষী বলেন, চীনের নববর্ষ উপলক্ষে কাকড়ার দাম অনেক বৃদ্ধি পায়। তাই আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে কাকড়া ক্রয় করে খামারে মজুদ করেছিলাম। যখন বিক্রির উপযোগী হল, তখনই চীনে রপ্তানি বন্ধের কারণে ডিপু মালিক ও ব্যবসায়ীরা কাকড়া ক্রয় বন্ধ করে দিল। এখন পূর্ন বয়স্ক এই কাকড়া কি করব ভেবে পাচ্ছি না।

রুবেল, আলমগীর, অনিমেশ মন্ডল বলেন, যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে কাকড়া বিক্রি করে লাভ তো দুরে থাক। চালান বাঁচবে না। যে কাকড়া ৫’শ টাকা কিনে চাষ করা হয়েছে তা ২শ টাকার কম দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। ঘেরে থাকা পূর্ন বয়স্ক কাকড়া মরতে শুরু করেছে। ১৫ দিনের মধ্যে এসব কাকড়া বিক্রি না করতে পারলে সব মরে মাটির সাথে মিশে যাবে। ব্যাংক, এনজিও এবং স্থানীয়ভাবে ঋণ করে কাকড়া চাষ করি। এ অবস্থা থাকলে পুজিঁ হারিয়ে পথে বসতে হবে।

রামপাল থানা কাকড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মন্ডল বলেন, চীনের নববর্ষকে কেন্দ্র কলে প্রচুর পরিমান কাকড়া ক্রয় করা হয়েছিল। কিন্তু রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় অনেক কাকড়া মারা যাচ্ছে। এভাবে চললে রামপালের চাষী ও ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ কাকড়া সরবরাহ সমিতির সাধারণ সম্পাদক অজয় দাস বলেন, চীনসহ কয়েকটি দেশে কাকড়া রপ্তানী হতো, এরমধ্যে অধিকাংশ কাকড়া রপ্তানী হতো চীনে। করোনা ভাইরাসের কারণে রপ্তানী বন্ধ হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছি আমরা। এ নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে বাগেরহাট জেলার কাকড়া চাষীদের ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হবে। যা এসব চাষী ও ব্যবসায়ীরা কোনদিন মেটাতে পারবে না। তাই চীনের বাইরে অন্যান্য দেশে কাকড়ার নতুন বাজার সৃষ্টি করে চাষীদের বাচিয়ে রাখার জন্য সরকারের উর্দ্ধোতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. খালেদ কনক বলেন বাগেরহাটে উৎপাদিত কাকড়া চীন, জাপান, মালেয়শিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, কোরিয়ায় রপ্তানি হত। এর মধ্যে চীনেই রপ্তানি হয় ৮০ শতাংশ। হঠাৎ করে চীনে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে চাষী ও ব্যবসায়ীরা যেমন বিপাকে পড়েছে। সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা চাষীদের ধৈর্য্য ধারণের পরামর্শ দিচ্ছি। উর্দ্ধোতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে নতুন বাজার সৃষ্টিরও বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করা হচ্ছে।