করোনা থেকে রেহাই পেতে যা প্রয়োজন

ডা. মো. ফজলুল হক

» উত্তরা নিউজ টোয়েন্টিফর, ডেস্ক রিপোর্ট | | সর্বশেষ আপডেট: ০৯ জুন ২০২০ - ১০:৪২:২৯ পূর্বাহ্ন

শ্রেষ্ঠ আদালত মানুষের বিবেক। করোনার ছোবল থেকে রেহাই পেতে যার যার বিবেকই মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তাই স্বাস্থ্য বিধি মেনে চললে কোনো সমস্যাই হওয়ার কথা নয়। এ ব্যাপারে সবার তত্পর হওয়া সময়ের দাবি।

করোনাভাইরাস অদৃশ্য থেকে সমগ্র বিশ্বের ৭০০ কোটি মানুষকে ক্ষতি করেই চলছে। আঘাত হানছে মানুষের জীবন, জীবিকা ও রুজি-রোজগারের ওপর। পরোক্ষভাবে আঘাত হানছে অর্থনীতি, জীবনযাত্রাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে। ভেঙে পড়ছে শিক্ষা, গবেষণা কার্যক্রমসহ অনেক কিছু। বিশ্বে খাদ্যাভাবে কত প্রাণহানি ঘটবে তা আল্লাহই ভালো জানেন। তবে বাংলাদেশে খাদ্যের কোনো ঘাটতি নেই—এটিই আমাদের জন্য বড় আশার আলো। খাদ্যের অভাবে ভেনেজুয়েলায় গরুর রক্ত খেয়ে জীবন ধারণ করছে। বিদেশে চাকরি হারাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। করোনা ঠেকাতে না পারলে অচিরেই মহাবিপর্যয় দেখা দেবে বিশ্বব্যাপী।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ধূমপায়ী, মাদকসেবী, ডায়াবেটিস, হার্ট, কিডনি ও লিভারের সমস্যাজনিত রোগীরা করোনাভাইরাস দ্বারা বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছেন। এর অর্থ এই নয় যে অন্যরা বিপদমুক্ত। শিশু থেকে সব বয়সের মানুষই মারা যাচ্ছে। সুতরাং এখনো সময় আছে সতর্ক হওয়ার। ভবিষ্যতে মহাবিপদের আশঙ্কা রয়েছে। ভ্যাকসিন পাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হবে।

ভারতের জনপ্রিয় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দেবী সেঠি বলেন, করোনা থেকে বেঁচে থাকতে আগামী এক বছরের জন্য বেশ কয়েকটি বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যেমন—আগামী এক বছর বিদেশ ভ্রমণ থেকে বিরত থাকা, বিয়ে বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে না যাওয়া, সিনেমা হল, শপিং মল, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি, হাট-বাজার এড়িয়ে চলা, বাইরের খাবার না খাওয়া,  পার্ক ও পার্টি এড়িয়ে চলুন, এক বছর কোনো ভিড়ের মধ্যে যাবেন না, বাইরে থেকে এসে সঙ্গে সঙ্গে গোসল করা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়মিত ব্যবহার করা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, জুতা ঘরের বাইরে রাখা, মাক্স মুখ বরাবর রাখা, ঘড়ি ব্যবহার না করা, সামনাসামনি দাঁড়িয়ে আলাপরত না থাকা, হাঁচি, কাশি থেকে দূরে থাকা, গোলমাল করে ভিড় জমানো যাবে না এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

ডা. বিজন কুমার শীল (ভেটেরিনারিয়ান) করোনাভাইরাসকে অঙ্কুরে বিনাশ করার দুটি পথ খোলা রয়েছে বলে জানান। তিনি সার্স ভাইরাসের ফুইফ টেস্ট পদ্ধতির আবিষ্কারক। তিনি ১৯৯৯ সালে ছাগলের মড়ক ঠেকানোর জন্য পিপিআর ভ্যাকসিনের উদ্ভাবক, ২০০২ সালে ডেঙ্গুর কুইক টেস্ট পদ্ধতির উদ্ভাবক এবং ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের কুইক টেস্ট পদ্ধতির আবিষ্কার করেন (স্টাফ বার্তা রিপোর্ট)। ডা. বিজন কুমার শীলের পরামর্শ হলো—ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন—পেয়ারা, লেবু, আমলকী অথবা ভিটামিন সি ট্যাবলেট খেতে হবে। সম্ভব হলে রাতে একটি জিঙ্ক ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য ভিটামিন সি এবং জিঙ্ক শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সতেজ, সজীব রাখে, প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। রং-চায়ের সঙ্গে আদা, লবঙ্গ ও একটি গোলমরিচ মিশিয়ে নিয়মিত খাওয়া। এর সঙ্গে মধু  বা চিনি মিশ্রিত করে খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে বলে তথ্যে জানানো হয়। তা ছাড়া লবঙ্গ, গোলমরিচ ও আদা-চা দিয়ে গড়গড়া করলে গলার মধ্যে অবস্থিত ভাইরাস  মারা যায় এবং গলার রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়।

অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রীনা ফ্লোরা—উপদেশ দিয়েছেন, যা অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। তিনি বলেন, কিছু বাজে অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে—যেমন থুথু দিয়ে টাকা গোনা, কথায় কথায় মুখে আঙ্গুল দেওয়া, কলমের মুখ কামড়ানো, আঙ্গুল জিহ্বায় লাগিয়ে বই খাতার পৃষ্ঠা উল্টানো। ধূমপান পরিহার করারও পরামর্শ দেন তিনি।

নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে ১৫ থেকে ৩০ মিনিট, এতে মাংসের কার্যক্ষমতা বাড়বে। ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। ভিটামিন ডি শরীরের অতি প্রয়োজন, রোদে ঘোরাঘুরি করলে তা পাওয়া যায়, বাচ্চাদের বেশি দরকার। ভাত কম খেয়ে শাক-সবজি, ফলমূল, বিশেষ করে লেবু বা অন্য যেকোনো টকজাতীয় খাবার ইত্যাদি  খেতে পরামর্শ দেন সব বিশেষজ্ঞই। ফাস্ট ফুড সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। চিনি ও লবণ যতদূর সম্ভব কম খেতে হবে। বিভিন্ন মসলা যেমন—লবঙ্গ, লং, জিরা, দারচিনি ও হলুদ দারুণভা¬েব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কালিজিরা মধুর সঙ্গে খাওয়া  এবং ভর্তা তৈরি করেও খাওয়া উত্তম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের এ পরামর্শগুলো মেনে চললে শুধু করোনাভাইরসই নয়, অনেক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরিতে কাজ করবে।

উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে জাপানে সার্স ভাইরাস মহামারির পর তাদের এ অভ্যাসগুলো গড়ে ওঠার কারণে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনার ছোবলসহ বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে এ অভ্যাসগুলো ভবিষ্যতে আমাদের কাজে আসবে।

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ের প্রধান হাতিয়ার জনসচেতনতা। সময়ের একফোড়, অসময়ের ১০ ফোড়। ভালো ফলাফল পেতে অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। করোনার ছোবল থেকে জীবন বাঁচাতে স্বাস্থ্য বিধি মেনে ঘরে থাকার কোনো বিকল্প নেই। অন্যদের কাছাকাছি অবস্থান জীবনের জন্য বিপজ্জনক। কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে সে নিজেই মৃত্যুবরণ করবে। অন্যদের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কিন্তু করোনা আক্রান্ত এক ব্যক্তি থেকে পর্যায়ক্রমে পরিবারের ছোট-বড় সবাই আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়তে পারে। আক্রান্ত এক ব্যক্তি থেকে শতজন বা তারও বেশি আক্রান্ত হতে পারে। নিজের জীবনের মূল্য দুনিয়ার সবকিছুর চেয়েও বেশি।

করোনা মহামারি থেকে বাঁচার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল থেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। যেকোনো সমস্যা সমাধানে সরকারকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়। এ ভাইরাসটি নতুন আবির্ভূত হওয়ায় ডায়াগনস্টিক ল্যাব, প্রশিক্ষিত ডাক্তার, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ানের স্বল্পতার কারণে যথাসময়ে সবকিছু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে প্রায় ৫০টি ল্যাব চালু  থেকে কাজ করে যাচ্ছে। ল্যাব আরো প্রয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের, কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে করোনার বিরুদ্ধে কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যা বিশ্বের অন্যান্য দেশও অনুসরণ করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক কর্মী অভাবী জনগোষ্ঠীকে খাদ্য সবরাহ করেন। বিশেষ করে যুবলীগ, কৃষক লীগ, এমনকি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও কৃষকের পাকা ধান কেটে কৃষকের বাড়িতে তুলে নজির স্থাপন করেছেন। কৃষি অধিদপ্তরের অধীন জেলা ও উপজেলা থেকে ধান কাটা ও মাড়াই মেশিন সরবরাহ করে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ধান কেটে কৃষকের ঘরে তোলা হয়েছে। ফলে দেশে খাদ্যঘাটতি হবে না, রেহাই পেয়েছে দেশ। চিকিত্সক, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আর্মিসহ যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বাঙালি জাতি তাদের সম্মানের সঙ্গে শরণ করছে। শ্রেষ্ঠ আদালত মানুষের বিবেক! তবে কিছু মানুষের একগুয়েমীর কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা দুরুহ ব্যাপার।  বেশির ভাগ মানুষই স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি হয়ে আছেন। কিছুসংখ্যক কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করছেন না। এমনকি মুখে মাক্স পর্যন্ত ব্যবহার করছেন না। রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন—তাঁরাই নিজের পরিবারের এবং সমাজের জন্য মহামারি বাহক হিসেবে কাজ করছেন। সুতরাং এ মুহূর্ত থেকেই আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে বেঁচে থাকার জন্য সবকিছু মেনে চলব, নিজে বেঁচে থাকব, অন্যকে বেঁচে থাকতে সহযোগিতা করব।  করোনামুক্ত বাংলাদেশ চাই—যেখানে সবাই মিলে সুস্থ থাকব—এ প্রত্যাশা হোক দলমত নির্বিশেষে সবার। আমি করোনামুক্ত থাকলে আমার পরিবারের সবাই নিরাপদ থাকবে, দেশ নিরাপদ থাকবে, বিশ্ব নিরাপদ থাকবে।

লেখক : অধ্যাপক ও রেজিস্ট্রার, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর