করোনা আশির্বাদ হিসেবে এসেছে জেলখানায় বন্দি শিশুদের জন্য

পৌনে দুই মাসে ৫৮৯ জনের জামিন

» এইচ এম মাহমুদ হাসান | | সর্বশেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২০ - ১১:১২:০১ পূর্বাহ্ন

আবু কাউসার (১০) (ছদ্দনাম)। মাদক মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে প্রায় একবছর টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বন্দি। সম্প্রতি এই রোহিঙ্গা শিশুটির জামিনের পর তাকে কক্সবাজারে তার পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর।

ইউনিসেফের আর্থিক সহযোগিতায় করোনা থেকে নিরাপদ থাকার সামগ্রীসহ কাউসারকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আরো একটি শিশুকে যশোর থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় বরিশালে, একটি মেয়ে শিশুকে গাজীপুরের কোনাবাড়ী থেকে পটুয়াখালীর গলাচিপায় নিজ বাড়িতে অভিভাবকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

কেবল এই তিনটি শিশুই নয়, সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন অভিযোগের মামলায় তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বন্দি এমন ৫৩টি মেয়ে শিশুসহ ৫৮৯টি শিশুকে গত ১২ মে থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিশু আদালত থেকে জামিন দেওয়া হয়েছে। করোনাকালে জামিন দেওয়া এসব শিশুর মধ্যে ৫৮৩টি শিশুকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে মুক্তি দিয়ে নিজ নিজ অভিভাবকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

আর মুক্তি পাওয়া এসব শিশুর মধ্যে ২৬ জনের অভিভাবক উন্নয়ন কেন্দ্রে না আসায় তাদেরকে ইউনিসেফের আর্থিক সহযোগিতায় নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে যেসব শিশুকে আটক করা হয়, তাদেরকে কারাগারে না রেখে দেশের তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়। যাতে তারা কারাগারে বড়দের সঙ্গে মিশে নতুন নতুন অপরাধে জড়িত হয়ে না পড়ে, পেশাদার অপরাধী হয়ে না ওঠে সেজন্যই শিশুদের উপযোগী করে গড়ে তোলা শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়। বিভিন্ন অপরাধের মামলায় আটক এসব শিশুকে সংশোধনের জন্য গাজীপুরের টঙ্গী ও কোনাবাড়ী এবং যশোরের পুলেরহাট এলাকায় পৃথক তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

এই তিনটি কেন্দ্রের মধ্যে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে মেয়ে শিশুদের রাখা হয়। বাকি দুটিতে রাখা হয় ছেলে শিশু।

জানা গেছে, গত ১২ মে পর্যন্ত এ তিনটি কেন্দ্রে বন্দি ছিল ১১৪৭টি শিশু। এদের মধ্যে গত ২ জুলাই পর্যন্ত জামিন হয়েছে ৫৮৯ জনের। এ সময় নতুন শিশু এসেছে তিন শ। জামিনে মুক্তির পর গত ২ জুলাই তিনটি কেন্দ্রে থাকা শিশুর সংখ্যা ৮৪৪। এরমধ্যে মেয়ে শিশুর সংখ্যা ৮১টি।

এসব শিশু বন্দি দশা থেকে নিজ বাসায় ফিরে গেলেও তাদের জামিনের ব্যবস্থা কিন্তু করেননি তাদের অভিভাবক। আপিল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের শিশুবিষয়ক বিশেষ কমিটির নির্দেশনা এবং শিশু আদালত ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে তাদের জামিনে মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার চিন্তা থেকেই এসব শিশুকে মুক্তির পদক্ষেপ নেয় বিশেষ কমিটি বলে জানা গেছে।

সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও হাইকোর্ট বিভাগের বিশেষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান  বলেন, ‘মাননীয় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের বিশেষ নিদের্শনায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মাননীয় বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর নেতৃত্বাধীন শিশুবিষয়ক কমিটি শিশুদের জামিনের পদক্ষেপ নিয়েছেন। এরইমধ্যে যেসব শিশু জামিন পেয়েছে, তাদের বিষয়ে সময়ে সময়ে প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করা হয়েছে।’

সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক(প্রতিষ্ঠান-২) এম এম মাহমুদুল্লাহ  বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে দেশে ভার্চুয়াল আদালত চালু হয় ১১ মে। আর এর পরদিন গত ১২ মে থেকে ভার্চুয়াল আদালতে শিশুর জামিন দেওয়া শুরু  হয়। গত ২ জুলাই পর্যন্ত ভার্চুয়াল আদালত থেকে তিনটি উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা ৫৮৯টি শিশুকে জামিন দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে ৫৮৩টি শিশুকে তাদের অভিভাবকের কাছে পৌছে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যেসব শিশুর অভিভাবক আসেননি, সেসব শিশুকে ইউনিসেফের সহযোগিতায় নিজ নিজ বাড়িতে পৌছে দেওয়া হয়েছে।

ইউনিসেফের বাংলাদেশস্থ শিশুর সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শাবনাজ জাহেরীন  বলেন, বিভিন্ন অপরাধে প্রতিদিনই কিছু না কিছু শিশুকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের রাখা হয় দেশের তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে। প্রতিদিন কিছু শিশু কেন্দ্রে আসে। আবার কিছু শিশুর জামিন হয়ে যায়। ফলে নতুন নতুন শিশুর আসা-যাওয়া চলতে থাকে নিয়মিত। ৬০০ শিশু রাখার মতো ধারণ ক্ষমতা রয়েছে এই তিনটি কেন্দ্রের। কিন্তু করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে নিয়মিত আদালত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুর জামিন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ১০-১২ দিনের মধ্যে কেন্দ্রে শিশুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়।

এ অবস্থায় কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিশু রাখা দুষ্কর হয়ে ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে ইউনিসেফ শিশুদের জামিনের জন্য পদক্ষেপ নেয়। তিনি বলেন, আপনারা সবাই জানেন, ইউনিসেফ গোটা বিশ্বজুড়ে শিশুদের কল্যাণে কাজ করে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের এসব শিশুকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে ইউনিসেফ পদক্ষেপ নেয়। তিনি বলেন, শিশুদের তাদের পরিবারের সঙ্গে রেখেই তাদের সুরক্ষা ও সেবা দেওয়ার দায়িত্ব থেকেই ইউনিসেফ এ পদক্ষেপ নিয়েছে।

করোনা সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে গত ২৬ মার্চ থেকে সারাদেশে নিয়মিত আদালত বন্ধ। এ প্রেক্ষাপটে ভার্চুয়াল আদালত চালু করতে গত ৯ মে আদালতে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০ নামে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এই অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আদালতকে মামলার বিচার, বিচারিক অনুসন্ধান, দরখাসত্ম বা আপিল শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক গ্রহণ, আদেশ বা রায় দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়।

এরপর ১১ মে থেকে ভার্চুয়াল আদালত কার্যক্রম শুরু হলেও শিশুদের জামিন বিষয়ে শিশু আদালতে কার্যক্রম শুরু হয় ১২ মে থেকে। যা এখনও চলমান।