করোনার বাহিরেও যেসব কারনে মরছি আমরা

শেখ হৃদয়

» উত্তরা নিউজ টোয়েন্টিফর, ডেস্ক রিপোর্ট | | সর্বশেষ আপডেট: ২৪ মে ২০২০ - ১২:১৯:২৬ অপরাহ্ন

আমরা শুধু করোনায় মরছি না, মরছি সিদ্ধান্তহীনতার বেড়াজালে ফেঁসে, মরছি সমন্বয়ের অভাবে আর সুষম বণ্টনের অভাবেও। দেশে করোনার আবির্ভাবে শুরুতেই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে রাস্তাঘাট লকডাউনের আওতায় আনা হলো। সরকারি বেসরকারি অফিস বন্ধের বেশ পরেই কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ না করেই বন্ধ করা হলো তা। টানা কাজের চাপে হাঁপিয়ে পড়া মানুষগুলো একটু সুযোগ পেতেই ছুটে চললো স্বজনদের কাছে। বেতন না পেলেও খালি হাতে যাননি তারা। সাথে করে নিয়ে গেলেন করোনা নামক এক বিষ।

এরপরে আবার চালু করা হলো কারখানাগুলো, আর দ্বিধাদ্বন্দ্বের বেড়াজালে পড়লেন খেটে খাওয়া এসব মানুষগুলো। চাকরি বাঁচাতে আবার ছুটলেন শহরের পানে। এছাড়া দোকানপাট, শপিংমল, ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও একই কাজ করা হলো। প্রথমে বন্ধের নির্দেশ আসে। পরে কোন স্বাস্থবিধি মানা হবে না জেনেও খুলে দেওয়া হলো সব।

গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করা হয়েছিলো অনেক আগেই। ঈদকে সামনে রেখে অনেকটা জানালা বন্ধ করে দরজা খোলার মতই প্রাইভেট কার আর মাইক্রোবাস যোগে ঢাকা যাওয়া বা আসার অনুমিত দেওয়া হলো। এতে করে আবারো প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত করোনা বিস্তারের একটা সুদৃঢ় দ্বার উন্মোচন করা হলো বলে আমি মনে করছি।

এই যে সিদ্ধান্তহীনতা, এসবের জন্যও এ মহামারি চরম পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে না? করোনা চিকিৎসার বিষয়ে আসি; করোনা চিকিৎসায় আইইডিসিআর, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে মতের অমিল সুস্পষ্ট, এবংকি এদের নিজেদের মধ্যেকার মতামতও তালগোল পাকানো। হটাৎ করে আইইডিসিআর’কে করোনা পরিক্ষা থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। আইইডিসিআর’কে তাদের গবেষণায়ও সীমাবদ্ধতা জুড়ে দেওয়া হলো৷ অনেকে এ বিষয়ে ভুলভাল টেস্ট রিপোর্ট প্রকাশের অভিযোগ করেছেন আইইডিসিআর-এর বিরুদ্ধে।

এদিকে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ের কাজটি গ্রহণ করলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যে কাজটি তারা আগেই থেকেই করতে পারতো। কেন আইইডিসিআর-এর সীমাবদ্ধতার কথা আগে ভাবা হয়নি?
এছাড়া করোনা পরিক্ষার জন্য বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ল্যাব সংযুক্ত করতে যথেষ্ট ধীরগতি সম্পন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এবার খাদ্য; করোনা সংকটে নতুন করে প্রায় চার কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছে বলেছে খবর প্রকাশ করেছে ব্রাক। ইতোমধ্যে খাদ্যাভাবে মারা যাওয়া এবং আত্নহত্যার মত ঘটনাও আমাদের অজানা নয়। হতদরিদ্র এসব মানুষকে সাহায্যার্থে অনেক বড়সড় একটা তহবিল ঘোষণা করেছে সরকার। কিন্তু তা বণ্টন হচ্ছে না ঠিকমত। জনপ্রতিনিধিরা চুরি করছেন অসহায় দুস্থ মানুষগুলোর মুখের আহার। তাছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে অনেক বিরূপ তথ্য। যেখানে দেখা যাচ্ছে সরকারি ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে ভুল জনগণের হাতে। জনপ্রতিনিধিদের আত্নীয়রা তুলনামূলক সচ্ছল হলেও তারা ত্রাণ পাচ্ছেন।

আবার আরেকদিকে কৃষকদের ফসল নষ্ট হচ্ছে। শহুরে বাজারে চাহিদা থাকলেও চাষীরা শস্য বাজারজাত করে শহরে পাঠাতে গিয়ে পড়ছেন নানা বিপাকে। প্রান্তিক চাষীদের অধিকাংশ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন। যেকোন এক মৌসুমে ফসলের ক্ষতি তাদেরকে সর্বস্বান্ত করে দিতে পারে, আর হচ্ছেও তাই। ফসল নষ্টের বিষয়ে কৃষিমন্ত্রণালয় তাদের বিভিন্ন সাময়িক উদ্যোগের কথা জানালেও কার্যকরী কোন ভূমিকা নেই এ বিষয়ে।

ঠিক এই মুহূর্তে যদি করোনা চলে যায়, তবুও সংশ্লিষ্ট কারণগুলোতে করোনা পরবর্তী বিপর্যয় সামাল দেয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। করোনা সংকটে করোনার চেয়ে বড় মহামারি আমাদের এসব নির্বুদ্ধিতা। আমাদের সিদ্ধান্তহীনতা, সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বয়ের অভাব আর কতিপয় রাজনীতিবিদদের অসাধুতা, সব মিলিয়ে এ মহামারিকালীন জাতীয় পরিস্থিতি আরো বিপর্যস্ত করে তুলছে। করোনার বাহিরেও আমরা মরছি এসবে, করোনা বিদায়েও মরবো। মতামত লেখকের নিজস্ব

 

লেখক :  বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কবি ও কলাম লেখক

ই-মেইল: bdhridoy24@gmail.com