করোনাভাইরাস মহামারি : আরো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বাংলাদেশ

ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার

» উত্তরা নিউজ | অনলাইন রিপোর্ট | সর্বশেষ আপডেট: ০৭ মে ২০২০ - ০৩:৫৯:৫৭ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশটির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। তিনি পিতার দেখানো আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করেছেন এবং দেশটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। করোনা (কভিড-১৯) পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব ও দৃঢ়তা প্রশংসনীয়। তবে সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বে তিনি একা। বাকিদের বেশির ভাগই এ ক্ষেত্রে দক্ষতা প্রদর্শনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তায় পটুতা দেখিয়েছেন। কভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের মধ্যে বিচক্ষণতার ও সমন্বয়ের অভাব ছিল। এটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর পেশাদারিত্বশীল আমলাতন্ত্রের বড় ব্যর্থতা। 
ডাক্তার, নার্স ও অন্য চিকিত্সাকর্মীদের জন্য মাস্ক, গাউন, গ্লাভস এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের (পিপিই) অভাব এবং কভিড-১৯ টেস্টিং সরঞ্জাম ও শ্বাসযন্ত্রের মেশিন (ভেন্টিলেটর) অপ্রতুলতা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা বলে প্রতীয়মান হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কোনো কন্টিনজেন্সি পরিকল্পনা ছিল কি না জনমনে সন্দেহ দেখা দেয়। মাঠ পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর অবস্থা আরো নাজুক।
ভেন্টিলেটর সুবিধা না থাকার কারণে দেশের রিজিওনাল সিলেট হাসপাতালে করোনাভাইরাস আক্রান্ত একজন ডাক্তারের চিকিত্সা সম্ভব হয়নি। মানসম্মত ও পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া চিকিত্সাসেবা দিতে গিয়েই তিনি আক্রান্ত। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে অবগত যে শেষ মুহূর্তে ডাক্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশটির রাজধানী শহর ঢাকায় চিকিত্সা করতে আসেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ যাঁরা দম্ভ করে কথা বলেছেন, খুব ভালো প্রস্তুতির কথা বলেছেন, তাঁরা কেউ পদত্যাগ করেননি। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এজাতীয় সংকটজনক পরিস্থিতি মোকাবেলায় খুব খারাপ প্রস্তুতি নিয়ে, ভালো প্রস্তুতি আছে দাবি করেছে। এটি সাংঘাতিক অন্যায়। বরং বাস্তবতা স্বীকার করা ভালো ছিল।
যেমন বলা যেত : এরূপ পরিস্থিতির জন্য আমরা একেবারেই তৈরি ছিলাম না। এর জন্য বিদ্যমান কন্টিনজেন্সি প্ল্যানও যথেষ্ট নয়। কভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এই মুহূর্তে বিশ্ববাজারেও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসুরক্ষা উপকরণ নেই। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। ডাক্তার-নার্সরা অপ্রতুল ব্যবস্থার মাঝে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রতিশ্রুতিশীল। তাঁরাই এখনকার মূল যোদ্ধা। পরিস্থিতি খারাপ হলে আমাদের জন্য বিষয়টি জটিল হবে। ইউরোপ-আমেরিকাই হিমশিম খাচ্ছে। সবাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সহায়তা করুন।
উল্লেখ্য, এই মন্ত্রণালয়ের জন্য অর্থায়ন মূল সমস্যা নয়। প্রধানমন্ত্রীর সুবিবেচনার কারণে গত প্রায় এক দশকেরও  বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের বাজেটে স্বাস্থ্য খাত একটি অগ্রাধিকার বরাদ্দের বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশ্বব্যাংকের একজন পরামর্শক হিসেবে অনানুষ্ঠানিকভাবে অবগত যে শুধু কভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলায় সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক মন্ত্রণালয়টিকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহযোগিতা প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
দুর্নীতি গবেষণাপত্র, ভুক্তভোগীদের মতামত ও জনমানুষের সাধারণ ধারণা থেকে এটি প্রকাশ পায় যে মন্ত্রণালয়টির মূল সমস্যা সিস্টেমলস, ক্রয় সম্পর্কিত আমলাতান্ত্রিক স্বার্থ, উপকরণগত সীমাবদ্ধতা, কর্তব্যে অবহেলা, দুর্বল জনস্বাস্থ্য পরিষেবা, মানসম্মত জবাবদিহি কাঠামো তৈরিতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সংকটজনক পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভালো কন্টিনজেন্সি পরিকল্পনার অভাব।
যাই হোক দেশটিতে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এখনো সীমিত। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় এটি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে এবং আক্রান্ত রোগীর মধ্যে মৃত্যুহার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। জনগণ যদি এখনো স্বপ্রণোদিতভাবে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সহায়তা না করে, তবে দেশটির জন্য বিপর্যয় অপেক্ষা করবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার একটি কৌশলগত বিষয়। বিস্তৃত ক্ষয়ক্ষতি পুনরুদ্ধারের জন্য এবং সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির উন্নয়নে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কৌশলগত সহযোগিতার প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রয়োজন। সরকার, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি ও উন্নয়ন অংশীদারদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে আমরা বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চালাতে পারব। আপাতত সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টায় ফোকাস করা অপরিহার্য।
সে পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে লকডাউন পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাষ্ট্রের অপারেটিং কোর এবং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশকে লক্ষ্য করে প্রধানমন্ত্রী ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা (আট হাজার ৫৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) উদ্দীপনা প্যাকেজ উন্মোচন করেছেন। তবে জনগণ সহায়তা না করলে লকডাউন দীর্ঘায়িত হতে থাকবে; এবং তা রাষ্ট্রের ও বেশির ভাগ জনগণের সামর্থ্যের বাইরে। বিকল্প পথটি অত্যন্ত ভয়াবহ। লকডাউন তুলে দিলে আমি আপনি যে কেউ আক্রান্ত হতে পারি। মৃত্যুহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। হয়তো বেশির ভাগ, এমনকি ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি টিকে থাকবে। দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো উন্নয়ন অংশীদার, এনজিও, করপোরেট ও ধনী ব্যক্তিদের ব্যাপক সহযোগিতা।
বিধাতা সহায়। এই পরিস্থিতি থেকে মানব সভ্যতা উত্তরিত হবে। বাংলাদেশও উত্তরিত হবে। কিন্তু এ দেশের মানুষকে এখন সামষ্টিকভাবে ও তাত্পর্যপূর্ণভাবে ভাবতে হবে হেলথ সেক্টর (স্বাস্থ্য খাত) বা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে মানসম্মতভাবে বাঁচানো কতটা জরুরি। দেশটির নেতৃত্ব, প্রশাসন, করপোরেট সেক্টর, সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন, চিকিত্সক, স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিত্সাবিজ্ঞানী ও সমাজগবেষকদের কাছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে মানসম্মতভাবে বাঁচানো এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতি থেকে আরো একটি বিষয় উদ্ভাবিত হলো যে গত ১০ বছরে একজনের দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশটির উন্নয়ন খুব দ্রুত ত্বরান্বিত হয়েছে এটা ঠিক। কিন্তু দুর্যোগ বা বিপর্যয় মোকাবেলায় শক্তিশালী সেক্টরাল কন্টিনজেন্সি পরিকল্পনার ভিত ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো ভালোভাবে তৈরি হয়নি। এর কারণ সম্ভবত নেতৃত্বের ও প্রশাসনের বড় অংশের নৈতিক এবং কৌশলগত দক্ষতার অভাব।
দেশটি প্রধানমন্ত্রীর অবর্তমানে একটি বড় ধরনের আদর্শিক নেতৃত্বসংকটে পড়তে পারে। তাই এর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উচিত তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের আদর্শিক, উচ্চশিক্ষিত ও কৌশলগতভাবে দক্ষ নেতৃত্ব বিকাশের দিকে মনোনিবেশ করা। তারাই দেশটির স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে। দেশটির জাতির পিতার অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, 
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।