করোনাভাইরাস চাপের মুখে অর্থনীতি

ব্রাংকো মিলানোভিচ

» উত্তরা নিউজ | অনলাইন রিপোর্ট | সর্বশেষ আপডেট: ০৪ মে ২০২০ - ০৪:০৮:২৬ অপরাহ্ন

গোটা বিশ্ব এমন এক অশুভ শক্তির কবলে পড়েছে, যার সঙ্গে পেরে উঠা যাচ্ছে না এবং কবে মুক্তি মিলবে, তা কেউ সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না। নতুন করোনাভাইরাসের কারণে যে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, সেটাকে কোনো সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সাধারণ ব্যাস্টিক অর্থনীতি দিয়ে তা সামাল দেওয়া যাবে না কিংবা সংকটের উপশম ঘটানো যাবে না। বরং অর্থনীতিতে আসতে যাচ্ছে নিগূঢ় মৌলিক পরিবর্তন।

চাহিদার বিপরীতে সরবরাহব্যবস্থায় ইতিমধ্যে সংকট তৈরি হয়েছে। সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণ হলো প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অথবা সংক্রমণ থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষার স্বার্থে কাজের চাপ কমিয়ে শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুদহার কমিয়ে শ্রমিক সংখ্যার ঘাটতিজনিত এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

চাহিদার অবনমনও সরবরাহব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলেছে। লোকজন অবরুদ্ধ জীবন যাপনে বাধ্য হওয়ায় অনেক ধরনের চাহিদা এখন নিম্নমুখী। ফলে বন্ধ রয়েছে অনেক পণ্যের সরবরাহ ও সেবাব্যবস্থা। সীমান্তগুলো যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, বন্ধ করে দেওয়া হয় বিমান যোগাযোগ, তবে চাহিদা ও সেবামূল্যে কোনো ধরনের সমন্বয়েই বিমানযাত্রীর সংখ্যা বাড়ানো যাবে না। লোকজন যদি করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে রেস্টুরেন্টে বা গণজমায়েতে যেতে ভয় পায় অথবা এসব জায়গায় যাওয়ার ওপর যদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, তবে যত ভালো ব্যবস্থাপনার আয়োজনই করা হোক না কেন, তাতে কাজ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

এভাবে চলতে থাকলে বিশ্ব এক গভীর পরিবর্তনের সম্মুখীন হবে, ফিরে আসবে সহজাত এক অর্থনীতি। তখনকার অবস্থা হবে আজকের বিশ্বায়নের একেবারে বিপরীত। বিশ্বায়নের কারণে যেখানে শ্রম বিভাজন আর অসম অর্থনীতি জন্ম নিয়েছে, সেখানে সহজাত অর্থনীতি মানুষকে স্বনির্ভরতার দিকে নিয়ে যাবে। পরিবর্তনটা যে ঘটবেই, তেমনটা নয়। জাতীয় সরকারগুলো যদি আগামী ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে মহামারিজনিত সংকট সামাল দিতে পারে, তবে বিশ্ব আগের মতোই বিশ্বায়নের পথে হাঁটবে। হয়তো কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে।

কিন্তু মহামারির কারণে সৃষ্ট সংকট যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে বিশ্বায়ন ভেঙে পড়তে পারে। সংকট যদি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়, মানুষের চলাচলে আর পণ্য সরবরাহব্যবস্থায় বাধা দীর্ঘায়িত হবে এবং পুঁজি অলসভাবে পড়ে থাকবে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় এ অবস্থাই স্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান হবে। তখন ওই অবস্থায় টিকে থাকার স্বার্থে বিশেষ চাহিদার উদ্ভব হবে। এর পাশাপাশি যদি আরেকটা মহামারিতে আক্রান্ত হওয়ার ভীতি অব্যাহত থাকে, তবে পৃথিবীর সব জাতির মধ্যে আপনাআপনিই স্বনির্ভরতার দিকে ধাবিত হওয়ার তাগিদ দেখা দেবে। সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থেকে মানুষের মধ্যে ওই তাগিদ সৃষ্টি করতে পারে—এমন সম্ভাবনা রয়েছে। চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতক অবধি পশ্চিম রোম সাম্রাজ্যেরও একই গতি হয়েছিল। সেখানকার অর্থনীতির পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছিল এমন—লোকজন কেবল নিজের সম্পদের উদ্বৃত্ত অংশ অপরজনের সম্পদের উদ্বৃত্তের সঙ্গে বিনিময় করত। সেখানে অজানা ক্রেতাগোষ্ঠীর জন্য বিশেষায়িত উৎপাদন অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখেনি। পশ্চিম রোম সাম্রাজ্যের সে সময়ের পরিস্থিতি নিয়ে ‘দ্য ডিক্লাইন অব দ্য রোমান এমপায়ার ইন দ্য ওয়েস্ট’ বইয়ে গোটা সাম্রাজ্যে মানুষ ক্রমে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পের দিকে এগিয়ে গেছে, উৎপাদনে প্রাধান্য পেয়েছে স্থানীয় বাজার আর আশপাশের সুনির্দিষ্ট ক্রেতাগোষ্ঠীর চাহিদা।

বর্তমান অবস্থায় যাদের কর্মদক্ষতা কেবল একটি কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তারা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। যে ব্যক্তি নিজের খাবার নিজেই উৎপাদন করবে, পানি ও বিদ্যুতের জন্য সরকারি উৎসর ওপর নির্ভর করার যার প্রয়োজন নেই, সে ব্যক্তিই সবচেয়ে নিরাপদে থাকবে। ফলে সংক্রমণ থেকে দূরে নিরাপদে থাকার সম্ভাবনা তারই বেশি। এর মানে হলো শ্রম বিভাজনের বিদ্যমান অর্থনীতি এখন সুবিধার চেয়ে বেশি অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সহজাত অর্থনীতির দিকে ধাবিত হওয়ার ঘটনা এমনি এমনি ঘটবে না; বরং মহামারি রোগ আর মৃত্যুভয়ের মতো মৌলিক উৎকণ্ঠার চাপে ঘটনাটা ঘটবে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ কেবল ক্ষতের উপশম ঘটাতে সহায়ক হবে। অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো তাদের লক্ষ করে নেওয়া যেতে পারে, যারা কর্মহীন হয়ে পড়েছে এবং যারা কপর্দকশূন্য। এ শ্রেণির কষ্ট লাঘবের জন্যই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কিন্তু সেটা করা হলেও মহামারিতে হারানো মানবজীবনের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। এ ক্ষতির কারণেই সম্ভবত সমাজব্যবস্থা ধসে পড়বে। যারা কর্মহীন, আশাহীন আর সম্পদহীন হয়ে পড়বে, তারা স্বাভাবিকভাবেই অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনযাপনকারীদের বিরুদ্ধে রুখে উঠবে। বর্তমানে ৩০ শতাংশ আমেরিকান এমনিতেই নিঃস্ব। চলমান সংকটের কারণে যদি নিঃস্ব, কর্মহীন, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং তারা যদি ক্রুদ্ধ আর মরিয়া হয়ে ওঠে, তাহলে তারা যখন তখন যেকোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে। পরিস্থিতির জেরে যদি দাঙ্গা বা হামলার ঘটনা শুরু হয়ে যায় এবং সেসব সামাল দিতে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন পড়ে, তবে সমাজ ধসে পড়তে শুরু করবে।

সুতরাং অর্থনীতির সব কার্যক্রমের লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাজের পতন রোধ নিশ্চিতকরণ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মারাত্মক চাপের মধ্যে সমাজব্যবস্থা অটুট রাখাই যে অর্থনীতির সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, সেটা কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া চলবে না। আর এ গুরুদায়িত্ব মনে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালনের ভার নিতে হবে অগ্রসর অর্থনীতিকে।

লেখক: অধ্যাপক, বিশ্লেষক

সূত্র : ফরেইন অ্যাফেয়ার্স