করোনাভাইরাস আতঙ্কে আলেমদের প্রতিক্রিয়া ও আহ্বান


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ১২ মার্চ ২০২০ - ১২:৪৮:২৩ অপরাহ্ন

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনা। এ ভাইরাসে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে মানুষ। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মক্কা-মদিনাসহ বিশ্বের নানা দেশে মসজিদ, মাদরাসা, মন্দির, গির্জা, স্কুল, দর্শণীয় স্থান সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। স্থগিত করা হয়েছে মুসলমানদের মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত ওমরাহও।

ওমরাহ স্থগিতসহ করোনা আতঙ্কে প্রতিক্রিয়া, করণীয় ও আহ্বান ব্যক্ত করেছেন দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত আলেম-ওলামা ও ইসলামিক স্কলাররা। তাদের এসব বক্তব্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-

>> কাবা শরিফের প্রধান ইমাম শায়খ সুদাইসি

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে রোববার ইশার নামাজের পর কাবা শরিফের চত্ত্বরে বাইতুল্লাহর মেহমানদের উদ্দেশ্যে শায়খ সুদাইসি বয়ান পেশ করেন। সেখানে তিনি আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রশংসা করে উপস্থিত লোকদের বলেন-
‘হে আমার মুসলমান ভাইয়েরা! বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী এক ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এ ভাইরাস আল্লাহর হিকমতেই কার্যকর। এটা বান্দার প্রতি আল্লাহর পরীক্ষা। যাতে বান্দা তার দিকে ফিরে আসে।

আল্লাহ নিজেই বান্দাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করবো কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ ও জীবনের ক্ষতির মাধ্যমে। তবে ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ।’

সুতরাং এ ভাইরাসসহ যাবতীয় বিপদ থেকে আত্মরক্ষায় বান্দার জন্য জরুরি হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রাখা। শুধুমাত্র আল্লাহই কল্যাণ আনায়নকারী ও অকল্যাণ দূরীভূতকারী।

এ ভাইরাস আতঙ্কে আল্লাহর প্রতি আস্থাহীন হওয়া উচিত নয়। বরং ভাইরাস মুক্ত থাকতে তাওবা করা এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখা এবং দোয়া করা। যাতে আল্লাহ তাআলা এ ভাইরাস থেকে মুসলমানদের হেফাজত করেন।

পরিশেষে তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসে অস্থির, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও ভয় না পেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর রহমতের আশায় তাওবা করে তার দিকে ফেরে আসা এবং তা থেকে আত্মরক্ষায় হাদিসে বর্ণিত দোয়া করা সবার জন্য জরুরি। তিনি মুসলিম উম্মাহর জন্য ভাইরাস ও মহামারি থেকে হেফাজতের জন্য দোয়া করেন।

>>মুফতি তাকি উসমানি
চীন থেকে মহামারীতে রূপ নেয়া করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলেম ও সাবেক বিচারপতি মুফতি তাকি উসমানি করোনা ভাইরাস নিয়ে জরুরি এক ভিডিও বার্তা শেয়ার করেছেন। তাতে তিনি প্রাণঘাতী এ ভাইরাস থেকে বেঁচে থাকার পদ্ধতি সম্পর্কে দিক-নির্দেশনামূলক বয়ান করেছেন।
তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস। নতুন এ ভাইরাসের এখনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি। মহামারী রূপধারণকারী এ জাতীয় প্রাণঘাতি রোগ সম্পর্কে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

‘যখন মানব সমাজে পাপাচার বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তাআলা তাদের মাঝে এমন সব (নতুন নতুন মহামারী) বিপদাপদ ও রোগব্যাধি ছড়িয়ে দেন, যার নাম ইতোপূর্বে তাদের পূর্বপুরুষরাও শোনেনি।’

তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা গোটা মানবজাতিকে এসব ভাইরাস থেকে রক্ষা করুন। করোনা সংক্রমণের এ পরিস্থিতিতে মানুষের করণীয় হলো-
>> সর্বপ্রথম নিজের পাপাচারে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহমুখী হতে তওবা করা।
>> বেশি বেশি ইসতেগফার পড়া।
>> সংক্রমণ ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা।
>> যে সব কারেন সংক্রামক ব্যাধি ছড়াতে থাকে সেসব উপসর্গগুলো থেকে বেঁচে থাকা ও তা পরিত্যাগ করা।সাথেসাথে সর্বাত্মক সতর্কতা অবলম্বন করাও জরুরি।

যে কোনো অসুস্থতায় ধৈর্যধারণ ও আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনার সঙ্গে চিকিৎসা গ্রহণ করতে দিক-নির্দেশনাও দিয়েছে ইসলাম।

তিনি আরও বলেন, ‘সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত এলাকার অধিবাসীদের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লোমের নির্দেশনা হলো-
‘যদি তোমরা মহামারির (নতুন নতুন রোগ-ব্যাধির) কোনো সংবাদ শোন, তো সেখানে (আক্রান্ত অঞ্চলে) তোমরা প্রবেশ থেকে বিরত থাক। আর যদি কোনো শহরে বা নগরে কেউ সে মহামারিতে আক্রান্ত হয়, তো সেখান থেকে তোমরা বের হয়ে (অন্য কোনো অঞ্চলে) যেয়ো না।’ (বুখারি)

তিনি দুইটি দোয়া করার পরামর্শ দেন, যাতে করোনা প্রতিরোধে ফলপ্রসু সমাধান আসবে। আর তাহলো-
>>দোয়া ইউনুস-
لَااِلَهَ اِلَّا اَنْتَ سُبْحَانَكَ اِنِّيْ كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِيْن
উচ্চারণ : ‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জ্বালিমিন।’
>> সুরা আহজাবের ১৩ নম্বর আয়াতের অংশ বেশি বেশি পাঠ করা-
يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا
উচ্চারণ :‘ ইয়া আহলা ইয়াছরিবা! লা মুক্বামা লাকুম ফারঝিউ।’

ওমরা সাময়িকভাবে স্থগিত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওমরা ফরজ-ওয়াজিব কোনো বিধান নয়। তাই বৃহত্তর স্বার্থে সৌদি সরকারের এ পদক্ষেপে বিরোধিতা না করে তা মেনে নেয়া উচিত। আর হজের সময় এখনো অনেক বাকি, আশা করি ততদিনে আল্লাহ তাআলা পরিস্থিতি ঠিক করে দেবেন। ইনশাআল্লাহ।

>> করোনায় আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের তাওবার আহ্বান
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে তাওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান, ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের গ্র্যান্ড ইমাম শাইখুল হাদিস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ।

তিনি বলেন, আল্লাহর নাফরমানী বেড়ে গেলে দুনিয়ায় প্রাণঘাতী যে কোনো মহামারী নেমে আসে। করোনা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া কেবল ভাইরাস নয়। বরং এটা নাফরমানীর কারণে অনেক বড় গজবও বটে।

মানুষের বদ আমলের কারণেই করোনা ভাইরাসের মত রোগ আসে জানিয়ে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, বর্তমান বিশ্বে খারাপ কাজের পরিমাণ দিনদিন বেড়েই চলছে। মানুষ এখন ভালো কাজ করতে চায় না। মানুষ যখন গোনাহের কাজ করে, বদ আমল করে, তখন এর প্রভাব প্রকৃতির উপর পড়ে। আর মানুষের বদ আমলের কারণেই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে করোনা ভাইরাসের মত রোগ আসে।

তিনি বলেন, ‘এ প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে পরিত্রাণের জন্য একমাত্র উপায় হলো-
>> মানুষকে আল্লাহমুখী হওয়া।
>> আল্লাহর কাছে ছুটে আসা।
>> রোনাজারী করা।
বান্দা আল্লাহ তাআলঅকে ভুলে গেছে বলেই প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস আক্রমন করেছে।

তিনি গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দেশের সব ইমামদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন- যেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররামসহ দেশের সব মসজিদে আগামী জুমআর দিন দোয়া দিবস পালন করা হয়। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই মহামারী থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে পারেন।

তিনি প্রাণঘাতী মহামারী থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। নিজেদের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার চেষ্টা করতে বলেছেন।

মসজিদ ও ওমরা উন্মুক্ত ও চালু রাখতে ৩ আলেমের প্রতিক্রিয়া
করোনা ভাইরাসের প্রদুর্ভাবের কারণে ওমরা বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের দুই আলেম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এ দুই আলম তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন-

>> মুফতি দেলোয়ার হোসাইন
বাইতুল্লাহ তথা আল্লাহর ঘর। সেখানে আল্লাহর বান্দারা যাবেন। বিনা কারণে এতে বাধা দেয়া যায় না বলে মত ব্যক্ত করেছেন মিরপুর আকবর কমপ্লেক্সের মুহতামিম মুফতি দেলোয়ার হোসাইন।
তিনি বলেন, ‘যেসব রাষ্ট্রের মুসলমানদের মাঝে এখনো করো না ভাইরাসের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি, সেসব দেশের মুসলমানদেরকে ওমরার ভিসা দেয়া উচিত।
তবে সৌদি সরকারের গৃহীত ওমরা স্থগিতের সিদ্ধান্ত ইসলামি শরীয়ত পরিপন্থী নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘ওমরা কোনো ফরজ বিধান নয়। সাময়িক বিভিন্ন জটিলতায় এটি বন্ধ করা হয়েছে। এটাকে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলা যাবে না।

>> মুফতি রফিকুল ইসলাম সরদার
করোনাভাইরাস থেকে বাঁচাতে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা ও কান্নাকাটি করা জরুরি। এ ভাইরাসের কারণে ওমরার সফল বাতিল হয়েছে মুফতি রফিকুল ইসলাম সরদারের। তিনি বলেন, ‘যতদিন বাইতুল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে ততদিন ভালো থাকবে বিশ্ববাসী।

তিনি বলেন, ‘আমরা আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আমরা বস্তুবাদে বিশ্বাসী নই। যেই মহামারী আকারে ভাইরাসটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে, এই পরিস্থিতিতে তওবা এবং আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি পরিবেশ কায়েম করা জরুরি।

এই ভাইরাস বন্ধ করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। মুসলিমরা সবাই একথা স্বীকার করছে। সকল সমস্যার সমাধান তার কাছে। এই বিশ্বাস যদি মুসলমানের মনে থাকে, তবে এ বিশ্বাসের দাবি হলো-
‘বায়তুল্লাহ খুলে দেয়া। বায়তুল্লাহ থেকে মানুষ যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে সে দিকে বিশেষ নজর দেয়া। বায়তুল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে মানুষের মাঝে নানারকম সমস্যা তৈরি হতে পারে।’

এই মহামারির সময় বায়তুল্লাহকে আরও উম্মুক্ত করে দেয়া উচিত ছিল বলেও তিনি মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের উচিত বায়তুল্লায় আসা। আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা এবং তাদের কৃতকর্মের প্রতি অনুতপ্ত হওয়া। এটাই হতে পারে করোনা থেকে মুক্তি পাওয়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি।

তবে তিনি নিরাপত্তার বিষয়টিকে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না বলেও উল্লেখ করেন।

>> মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া
মারকাযুদ্দাওয়াহ আল ইসলামিয়ার প্রখ্যাত আলেম মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াইয়া বলেন, বিপদাপদ বালা মসিবত থেকে মুমিন-মুসলমানকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। তবে এ সচেতনতা যেমন এমন না হয় যে, মানুষের সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক দূরত্ব তৈরি হবে।

তিনি বলেন, ‘মুমিনদের তো এই আক্বিদা মজবুত করা উচিত যে, আল্লাহ বিপদ দিলে সব সতর্কতার মাঝেই দিতে পারেন। আর আল্লাহই প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে বান্দাকে রক্ষা করেন।

মসজিদে জুমআ তাড়াতাড়ি কিংবা বন্ধ রাখা প্রসঙ্গে এ আলেম বলেন, ‘যুগে যুগে দুর্যোগ কবলিত হলে মুমিনরা তো মসজিদেই আশ্রয় নিয়েছেন। মসজিদই তো আল্লাহর কাছে আশ্রয় ও ক্ষমা প্রার্থনার সর্বোত্তম জায়গা।

তবে ‘হ্যা, করোনা ভাইরাস যেহেতু সংক্রামক ব্যাধি। এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায় তাই বাহ্যিক সমস্ত সতর্কতাই গ্রহণ করতে হবে। ইসলামের শিক্ষাও এটাই। তবে এ জন্য মসজিদে গমন কিংবা জুমআ স্থগিত করা যাবে না।

করোনা ভাইরাসে করণীয় ও ওমরা স্থগিতাদেশে আলেমদের মতামত যা-ই হোক না কেন, করোনাভাইরাস মুক্তিতে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপদেশ ও আমলগুলো যথাযথ বাস্তবায়ন করা। তবেই করোনাসহ যাবতীয় সংক্রামক ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হবে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকার জন্য যথাযথ নির্দেশনা মানার, চিকিৎসা গ্রহণ করার এবং হাদিসের ওপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।