করোনাকালে ডেঙ্গু প্রতিরোধ

তৌহিদ উদ্দীন আহমেদ ও ড. মন্জুর আহমেদ চৌধুরী

» উত্তরা নিউজ টোয়েন্টিফর, ডেস্ক রিপোর্ট | | সর্বশেষ আপডেট: ১০ জুন ২০২০ - ১১:১৭:৩৮ পূর্বাহ্ন

এ বছর সবাই এখন করোনাভীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত বছরে ছিল ডেঙ্গুভীতি। করোনার মতো ডেঙ্গুও একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত বছর ডেঙ্গুতে প্রায় ২০০ লোকের মৃত্যু হয়। আক্রান্তের সংখ্যা ছিল লক্ষাধিক। করোনা মহামারির এই বিপজ্জনক সময়ের মধ্যেই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা অনেকের মনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এবারও দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিতে পারে। বছরের শুরুতে বেশি বৃষ্টিপাত এডিস মশা বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তা ছাড়া এ বছরের প্রথম তিন মাসে গত বছরের ওই সময়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। লকডাউনের কারণেও ঘরবন্দি মানুষ বেশি হারে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে।

এরই মধ্যে কয়েকটি দেশে, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ব্রাজিলে কভিড-১৯ মহামারির মধ্যেই ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ চলছে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে কভিড-১৯ মহামারির মধ্যেই ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে গেছে। এরই মধ্যে একই সঙ্গে কভিড-১৯ ও ডেঙ্গু উভয় রোগে আক্রান্ত হওয়ারও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে কভিড-১৯ মহামারির মধ্যে যদি ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব ঘটে, তবে সে ক্ষেত্রে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়বে। জাতি যেন এ ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন না হয় তার জন্য আমাদের সবাইকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বিষয়ে এখন থেকে আরো বেশি সচেতন ও সতর্ক হতে হবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে রোগটির সংক্রমণকারী এডিস মশা নিবারণ। এডিস মশা নিবারণে নাগরিক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা আছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে যে কার কী করণীয়, তা আমরা অনেকেই সম্পূর্ণভাবে অবহিত নই।

নাগরিকের করণীয়

ক. এডিস মশা মেরে ফেলার জন্য ঘরে নিয়মিতভাবে অ্যারোসল, ম্যাট, ভ্যাপোরাইজার প্রয়োগ করা। সম্ভব হলে মসকুইটো রিপেলেন্ট (ডিইইটি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ) ব্যবহার করা।

খ. ঘরের ভেতর, বাইরে কোথাও কোনো পাত্রে এক সপ্তাহের বেশি পানি জমে থাকতে না দেওয়া। অব্যবহার্য পাত্র, ড্রাম, বালতি, টায়ার, অন্যান্য আবর্জনার অপসারণ। পরিত্যক্ত চৌবাচ্চা (যদি থাকে) ভরাট করা অথবা প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর ডিজেল বা কেরোসিন প্রয়োগ করা। ফুলের টবের মাটির থালার পানি সপ্তাহান্তে নিষ্কাশন। অন্যথায় দুই সপ্তাহ অন্তর গ্রানুলার লার্ভিসাইড প্রয়োগ।

গ. বাড়িতে ডেঙ্গু রোগী থাকলে তাদের দিনরাত মশারির ভেতর রাখা, যাতে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে। অন্য সবার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের, দিনরাত যেকোনো সময় নিদ্রাকালে মশারি ব্যবহার করা।

সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের করণীয়

ক. লকডাউনে দীর্ঘদিন বন্ধ ভবনগুলোতে এডিস মশা বৃদ্ধি পেতে পারে। খোলার আগে ভবনগুলোতে ফগিং ও লার্ভিসাইডিংয়ের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় পাত্র, আবর্জনার অপসারণ। সব প্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি প্রচলন করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোভার স্কাউট, গার্ল গাইডের নেতৃত্বে পরিচ্ছন্নতা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা।

খ. নির্মাণাধীন ভবনগুলো এডিস মশার অন্যতম প্রধান উৎসস্থল। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব স্থানে প্রতি তিন দিন অন্তর জমে থাকা পানি নিষ্কাশন করে মশা নিবারণ করা সম্ভব নয়। নির্মাণাধীন ভবনে প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর মিস্ট ব্লোয়ার ও ফগারের সাহায্যে লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইডিং করা। প্রশিক্ষিত কর্মীদের সমন্বয়ে টিম গঠন করে সব নির্মাণাধীন ভবনে রিহ্যাবের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে মশক নিবারণ কার্যক্রম পরিচালনা করা।

গ. কিছু প্রতিষ্ঠানের (যেমন—পুলিশ স্টেশন, সরকারি অফিস) আঙিনায় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন, টায়ার ও অন্যান্য বস্তু খোলা জায়গায় বছরের পর বছর ফেলে রাখা হয়, যা আইনগত বাধ্যবাধকতার জন্য অপসারণ করা হয় না। বিভিন্ন নিরীক্ষায় এসব স্থান এডিস মশার অন্যতম প্রধান উৎসস্থল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে এসব স্থানে মশক নিবারণের জন্য দুই সপ্তাহ অন্তর লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইডিং কর্মকাণ্ড কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা।

ঘ. নগরের এলাকাভিত্তিক সমিতিগুলো মশক নিবারণ কর্মকাণ্ডে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের এসব সমিতির মশক নিবারণে জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যাপারে সহযোগিতা করা।

ঙ. কভিড-১৯-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের ডেঙ্গুমুক্ত রাখার জন্য সব কভিড হাসপাতাল, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রে রোগীদের মশারির ভেতরে রাখা, মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা। হাসপাতালের আশপাশে প্রতি সপ্তাহে সতর্কতার সঙ্গে অ্যাডাল্টিসাইডিং ও লার্ভিসাইডিং করা। প্রতি সপ্তাহে পাত্রে জমা পানি নিষ্কাশন, সেই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় পাত্র, আবর্জনা অপসারণ।

স্থানীয় সরকারের করণীয়

ক. গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মোবাইল ফোনের সাহায্যে জনগণকে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন ও সতর্ক করা।

খ. বাসস্টেশন, রেলস্টেশন, টায়ারের দোকান, নার্সারি, আবর্জনাপূর্ণ খোলা জায়গা, বাড়িঘরের আশপাশে এবং অন্যান্য এডিসপ্রবণ স্থানে প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইডিং কার্যক্রমের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় পাত্র ও অন্যান্য আবর্জনা অপসারণ। হাসপাতাল এলাকায় প্রতি সপ্তাহে মশক নিবারণ কার্যক্রম চালু রাখা।

গ. ডেঙ্গু রোগী আছে এমন সব বাড়ি চিহ্নিত করে সেসব বাড়ির ৫০ মিটারের মধ্যে সব বাড়িঘরে লার্ভিসাইডিং, অ্যাডাল্টিসাইডিং (ফগিং, ইউএলভি), অপ্রয়োজনীয় পাত্র ও আবর্জনা অপসারণ। অত্র এলাকার বাসিন্দাদের ডেঙ্গু শনাক্তকরণের মাধ্যমে রোগটির বিস্তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।

ঘ. কোনো এলাকায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মহামারি পর্যায়ে পৌঁছার প্রাক্কালে বা পৌঁছে গেলে অ্যাডাল্টিসাইডিং (ফগিং, ইউএলভি) করে ভাইরাসবাহী পূর্ণাঙ্গ এডিস মশা মেরে ফেলা নিশ্চিত করা। প্রথম সপ্তাহে তিনবার এবং পরবর্তী সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে একবার করে অ্যাডাল্টিসাইডিং করা। পরিস্থিতি অনুযায়ী সাপ্তাহিক লার্ভিসাইডিং ও এডিস প্রজননস্থল ধ্বংস কার্যক্রম চালু রাখা।

ঙ. মশকনিধনকর্মীদের পক্ষে বাসাবাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে এডিসের মতো গৃহবাসী, গৃহভোজী মশা নিধন করা প্রায়ই সম্ভব হয় না। নাগরিকরা যাতে নিজেরাই তাদের বাসাবাড়ির ভেতরে মশা নিবারণ করতে পারে তার জন্য চতুর্থ প্রজন্মের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ কীটনাশকের (আইজিআর, বিটিআই ইত্যাদি) সুলভে প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য আমদানি শুল্ক হ্রাস এবং নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা নিরসন করা। কভিড-১৯ মহামারির বিপজ্জনক সময়ে নাগরিকদের ডেঙ্গুমুক্ত রাখার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে কিংবা বিনা মূল্যে মসকুইটো রিপেলেন্ট (ডিইইটি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ) বিতরণ করা।

ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার মতো কীট সংক্রমিত রোগ প্রতিরোধে সরকারের উদ্যোগ ও নেতৃত্ব অপরিহার্য। জনস্বাস্থ্যে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিবারণের জন্য ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট বা আইভিএম একটি পরিবেশবান্ধব কার্যকর পদ্ধতি, যা বর্তমানে বহু দেশে প্রচলিত আছে। আইভিএম পদ্ধতি প্রচলন করার কথা অনেকবার বলা হলেও তা এখন পর্যন্ত বক্তৃতা, বক্তব্যেই সীমিত আছে। মশা নিবারণের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি গাইডলাইন বা নির্দেশিকা থাকা অবশ্য প্রয়োজন। এই নির্দেশিকার ওপর ভিত্তি করেই সিটি করপোরেশন, পৌরসভা কর্তৃপক্ষের মশা নিবারণের কৌশলপত্র প্রণয়ন করার কথা। কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার জন্য মশা নিবারণের গাইডলাইন প্রণয়ন করা যায়নি। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধের মূল ভিত্তি হচ্ছে এডিস মশা নিবারণ, যা সার্বিক অর্থে একটি কীটতাত্ত্বিক কার্যক্রম। কিন্তু এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদদের মশক নিবারণ কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করে রাখা হয়েছে। এতসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এখন করোনাকালের এই দুর্যোগ মুহূর্তে আমাদের সবার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করার।

লেখকদ্বয় : কীটতত্ত্ববিদ