কবি কাজী নজরুলের জন্মদিনের শুভেচ্ছা


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ২৫ মে ২০২০ - ১১:৫৬:২২ পূর্বাহ্ন

বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছিল অনেকটা পৌরাণিক এক অগ্নিদেবতার মতো। তিনি নিজ হাতে বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত প্রথা ভেঙেছেন, আবার নিজ হাতে গড়েছেন সাহিত্যের নবধারা। তাঁর লেখনীতে একই সাথে বিদ্রোহী ও জাতীয়তাবাদী চেতনার সংমিশ্রণ ঘটেছিল। যার কারণেই তাঁকে বিদ্রোহী কবি ও জাতীয় কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

নজরুলের কবিতা ও গানে বাঙালি জাতীয়তাবোধের যে স্ফুরণ দেখা যায়, তা বিংশ শতাব্দীর অনেক কবির রচনাতেই অনুপস্থিত। বিভিন্ন গল্প ও প্রবন্ধেও তাঁর এই চেতনার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তাঁর লেখা প্রবন্ধগুলোতে তিনি বিশ্বসমাজে বাঙালির পিছিয়ে থাকা এবং এ থেকে মুক্তির উপায় কী হতে পারে তার বর্ণনা করেছেন। বাঙালির সমাজ, সভ্যতা, রাজনীতি ছিল তাঁর আগ্রহের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রকাশ্যে ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেন। তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকর্মেই বাঙালি জাতীয়তাবোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

‘ধূমকেতু’ পত্রিকা সম্পাদনার সময় নজরুল প্রতি সংখ্যার সম্পাদকীয়তে ভারতবর্ষের স্বাধিকার আদায় নিয়ে লিখতেন। তাঁর এই পত্রিকা বাঙালি তরুণ সমাজে স্বাধীনতার স্বপ্ন তৈরিতে কাজ করেছে। ১৯৪৭ এর দেশবিভাগের জন্য সংঘটিত বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে নজরুলের লেখনী হয়ে উঠেছে উৎসাহ ও প্রেরণার উৎস। তার লেখনীতে প্রবল জাতীয়তাবোধের প্রকাশ স্বাধীনতাকামী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও নজরুলের কবিতা ও গান ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার উৎস। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত নজরুলের দেশাত্মবোধক গান প্রচারিত হতো। স্বাধীনতার পর নজরুল রচিত ‘চল্ চল্ চল্’ গানটিকে বাংলাদেশ সরকার রণসংগীত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নজরুল ইসলাম ব্যক্তিজীবনে স্বাধীনচেতা একজন মানুষ ছিলেন। তাই তিনি জাতিগতভাবেও স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।

হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন সশস্ত্র সংগ্রাম ব্যতীত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। তাই সেই বয়সেই তিনি এয়ারগান কিনে হাতের নিশানা ঠিক করার কথা ভেবেছিলেন। নজরুল বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন। ভাবতেন ভারতবর্ষের সব মানুষের মুক্তির কথা।

কাজী নজরুলের বাল্যজীবন, কৈশোরজীবন এমনকি তাঁর পুরো জীবনই ছিল দারিদ্র্যের আঘাতে জর্জরিত। এর মাঝেও তিনি সাহিত্য রচনা করেছেন, গান লিখেছেন, মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছেন। এমন প্রতিকূলতার মাঝেও তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল পরিপূর্ণভাবেই। ধারণা করা হয়, দারিদ্র্য তাঁকে সমাজবাস্তবতার স্বরূপ চিনতে সাহায্য করেছে, যার কল্যাণে তিনি সাহিত্য রচনায় পারদর্শিতা প্রদর্শন করেছেন। নজরুল নিজেও তার দারিদ্র্যতাকে এভাবে সম্বোধন করেছেন, ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান’। দারিদ্র্যের রূপ দেখার ফলে খুব অল্প বয়সেই নজরুল অনুধাবন করেছিলেন মানুষের মুক্তির কথা। এই ধারণা তাঁকে আরও অগ্রসর করে দেশের স্বাধীনতা আদায়ে।

নজরুল অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বাঙালির এই পিছিয়ে থাকার কারণ তাদের দাসত্ব। ইংরেজদের শাসন বাঙালিকে কীভাবে শক্তিমান, সাহসী জাতি থেকে পরাধীন এক দাসে পরিণত করেছে, তা নজরুল খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করেছিলেন। বাঙালির অর্থনীতির দুর্দশা যে ইংরেজ শাসনেরই ফল এটি বুঝতেও তাঁর খুব বেশি দেরি হয়নি। তাই অল্প বয়স থেকেই ইংরেজদের প্রতি নজরুল ছিলেন প্রতিবাদী। তাঁর বিদ্রোহী কবিতাগুলোর অনেকাংশই ইংরেজদের উদ্দেশ্য করে লেখা। তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে এই বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধিকার আদায়ের জন্য।

ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের বিশ্বাসঘাতক মনে করত। এ কারণে ইংরেজ সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের নিয়োগ দেওয়া হতো না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বিশিষ্ট বাঙালি নাগরিকদের দাবির মুখে ইংরেজ সেনাবাহিনীতে বাঙালি পল্টন খোলা হয়। ১৯১৭ সালে নজরুল সেনাবাহিনীর বাঙালি পল্টনে যোগদান করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি বাঙালিদের সাহস ও শৌর্য প্রকাশের সুযোগ হিসেবে মনে করতেন। তাই তিনি শুরু থেকেই প্রবল উৎসাহী ছিলেন সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে। নজরুলের সমগ্রজীবনই ছিল এমন। প্রতি পদক্ষেপে তিনি বাঙালিকে উচ্চাসনে দেখতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি নিজের সর্বোচ্চ শক্তি অর্থাৎ লেখনীর মাধ্যমেই বাঙালির মুক্তির আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সাথেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল স্বরাজ পার্টি। তিনি এই দলের সম্মেলনে অংশ নিতেন এবং কবিতাপাঠ ও বক্তৃতা দিতেন। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার ১৯২২ সংখ্যায় নজরুল ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি লিখেছিলেন। এই কবিতার কয়েকটি চরণ ছিল এমন-

আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?

স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।

দেবশিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,

ভূ-ভারত আজ কসাইখানা,-আসবি কখন সর্বনাশী?

দেব-সেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের দীপান্তরে,

রণাঙ্গনে নামবে কে আর তুই না এলে কৃপাণ ধরে?

এই কবিতার জন্য পুলিশ ধূমকেতুর ঐ সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে এবং নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এর কিছুদিন পর তাঁকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেল কর্তৃপক্ষের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে জেলে বসেই তিনি অনশন করেছিলেন। এছাড়াও বন্দিদের প্রতিবাদে উৎসাহী করার জন্য তিনি বিভিন্ন গান ও কবিতাও লিখেছিলেন সে সময়। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘প্রলয়োল্লাস’ জেলে বসেই লেখা। তাঁর এই যে ইংরেজবিরোধী লেখা ও তাঁদের বিরুদ্ধে অনশন – এসবের মাঝে তাঁর প্রবল জাতীয়তাবোধই ফুটে ওঠে। তিনি চাইতেন, সব অন্যায়-অত্যাচারের অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতি যেন মুক্তি ও স্বাধীনতা লাভ করে।

বাঙালির জাতীয় জীবনেও নজরুলের প্রভাব সীমাহীন। তাঁর রচনা মানুষকে যেমন স্বাধীনতা অর্জনে উৎসাহী করেছে, তেমনিভাবে বাঙালির জাতিগত ভুলগুলোকেও চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে। ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধে তিনি বাঙালি জাতির আলস্যের নিন্দা প্রকাশ করেছেন। নজরুলের প্রভাব-বলয় ছিল খুবই সক্রিয়। এই গুণের কারণে সবাইকে তিনি অল্প সময়েই মুগ্ধ করতে পারতেন। তিনি আসর জমাতেও ছিলেন পারদর্শী। গান, গল্প ও আড্ডার মাধ্যমে সবাইকে মাতিয়ে রাখা ছিল তাঁর স্বভাব। তাঁর তীক্ষ্ণ লেখনী ও শক্তিশালী শব্দচয়ন মানুষকে মোহিত করত। এই কারণে তাঁর লেখা ও বক্তৃতা মানুষকে আলোড়িত করেছিল সবচেয়ে বেশি। তাঁর এই প্রভাব তাঁকে শক্তিশালী একজন লেখকের মর্যাদায় আসীন করেছিল।

নজরুলের লেখা কবিতা ও গান সহজেই মানুষকে উদ্দীপ্ত করত। তিনি জাতীয় মুক্তির জন্য যা বলতেন ও লিখতেন তাতে যেন বারুদ লুকানো থাকত। মানুষের মধ্যে তা প্রকৃত অর্থেই আগুনের শিখার মতো ছড়িয়ে পড়ত। এই কারণে তাঁর রচনা বাঙালিকে যেভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছে, অন্য কারো ক্ষেত্রে সেরকমটি ঘটেনি। নজরুলের মধ্যে এক ধরনের স্বাধীনতাকামী স্পৃহা ছিল। তিনি লেখনীর মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিতেও ছিলেন পারদর্শী। বিশেষ করে তরুণ সমাজের কাছে তাঁর লেখাগুলো ছিল অত্যন্ত সমাদৃত। যৌবনের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ত তরুণ সমাজ। নজরুল তাঁর লেখনীর মাধ্যমে জাতীয়তাবোধকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

মূলত নজরুল তাঁর সমগ্র সাহিত্যজীবনকে ব্যয় করেছিলেন বাঙালির মুক্তি আদায়ে, বাঙালিকে একটি স্বাধীন জাতিতে পরিণত করতে। তাঁর জাতীয়তাবাদী চেতনা তাই তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরও এখনও সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর রচনায় খুঁজে পাওয়া যায় বাঙালির প্রাণের স্পন্দন। তাই যেকোনো সময়ে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে, সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে এবং অশুভশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহস যুগিয়েছে নজরুলের রচনা। এ কারণেই তিনি বাংলা ও বাঙালির কবি, বাঙালির জাতীয় কবি। কবির জন্মদিনে তাঁকে জানাই শুভেচ্ছা।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।