ঐতিহাসিক লংমার্চ -ভাসানী থেকে পীর সাহেব চরমোনাই


» উত্তরা নিউজ ডেস্ক জি.এম.টি | | সর্বশেষ আপডেট: ১৭ মে ২০২০ - ১২:০৯:৫৮ অপরাহ্ন

স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসে ভারত অভিমুখে তিনটা লংমার্চ অনুষ্টিত হয়। সেই তিন লংমার্চের নেতৃত্বে ছিলেন তিন জন যুগ সচেতন বিখ্যাত আলেম। তারা হলেন মাজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষাণী,শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক,মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম পীর সাহেব চরমোনাই। যে লংমার্চ গুলো ছিল ইতিহাস বিখ্যাত।

১)মাওলানা ভাষাণীর ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে লংমার্চঃ ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ভারত সরকার ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে একতরফা গঙ্গার জল অপসারণের মাধ্যমে পদ্মা নদীকে পানি শূণ্য করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলার আহবান জানান বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষাণী। দেশ ব্যাপি তিনি বিভিন্ন মিছিল মিটিং সমাবেশ করে প্রথমে দেশবাসীকে সচেতন করে তুলেন।এরপর ডাক দেন ভারতের ফারাক্কা বাঁদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক লংমার্চ।১৯৭৬ সালে ১৬ মে পদ্মানদীর তীরবর্তী রাজশাহী বিভাগীয় শহর থেকে ফারাক্কা বাঁধ অভিমুখে লংমার্চের যাত্রা করেন মাওলানা ভাষাণীর নেতৃত্বে বিশাল লংমার্চ।মাওলানা ভাষাণীর ইচ্ছা ছিল ভারতের অভ্যন্তরে তথা ফারাক্কা বাঁধ পর্যন্ত লংমার্চ নিয়ে যাবেন কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের পরামর্শে ভারতের অভ্যন্তরে যায়নি লংমার্চ

১৯৭৬ সালের ১৭ মে অপরাহ্নে ভারতীয় সীমান্তের কাছে কানসাটে গিয়ে ফারাক্কা অভিমুখের লংমার্চের সমাপ্তি ঘোষণা করেন মাওলানা ভাষাণী। তিনি ইসলাম দেশ মানবতার জন্য আমরণ সংগ্রাম করে গেছেন।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে পিতার মত শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁর পরামর্শেই চলতেন।জাতির এই প্রাণ পুরুষ ও বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মাওলানা ভাষাণীর মৃত্যু বার্ষিকীতে শ্রদ্ধার সাথে তাকে স্মরণ করছি।

২) শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক এর বাবরী মসজিদ নিয়ে লংমার্চঃ ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম লংমার্চ করেন মাওলানা ভাষাণী আর দ্বিতীয় লংমার্চ করে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ।১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের অযোধ্যায় অবস্থিত ৫শ বছরের ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ উগ্র হিন্দুত্বাদীরা শহিদ করে দেয়।সাথে সাথে মুসলমানদের উপরও চালানো হয় গণহত্যা।সেটা সহ্য করতে পারেনি বাংলাদেশের যুগ বিখ্যাত বুজুর্গ ও ইসলামী রাজনীতিক শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ।এর প্রতিবাদে দেশ ব্যাপি তিনি গণ আন্দোলন গড়ে তুলেন।তিনি ভারতের অযোধ্য অভিমুখে লংমার্চের ঘোষণা দেন।ঢাকায় তৌহিদী জনতার উত্তাল বাঁধা ভাঙ্গা জোয়ার সেদিন বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

১৯৯৩ সালের ২ জানুয়ারি শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ এর নেতৃত্বে ঢাকা থেকে লক্ষাধিক জনতার লংমার্চে যাত্রা করে অযোধ্য অভিমুখে।লাখ জনতার মিছিল খুলনা পৌছে ভারতের সীমান্তের দিকে যেতে চাইলে ভারতীয় বিএসএফ বৃষ্টির ন্যায় গুলি বর্ষণ করে।সেখানে দুইজন শহিদ হয়।বলতে গেলে শায়খুল হাদিস রহ এর এই লংমার্চ ইসলামী বিশ্বে প্রসংশিত হয়েছিল।

৩) টিপাইমুখ অভিমুখে পীর সাহেব চরমোনাইর লংমার্চঃ ভারত আদৌ বাংলাদেশের বন্ধু নয় যদিও তারা বন্ধু রাষ্ট্র বলে গলাফাটাই।কিন্তু বাস্তবে শত্রু দেশের মত আচরণ করে।স্বাধীনতার পর থেকে ভারত- বাংলাদেশ সীমান্তে বাংলাদেশের হাজারো নিরহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছে।ফারাক্কা থেকে টিপাইমুখে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশকে মরুভূমিতে পরিণত করার ষড়যন্ত্র কোন বন্ধু রাষ্ট করতে পারেনা যা ভারত করেছে।১৯৭৫ সালে ২১ এপ্রিল ফারাক্কা বাঁধ এবং ২০০৯ সালে এসে টিপাইমুখে বাঁধ দিয়ে ভারত বাংলাদেশের সাথে শত্রু দেশের ন্যায় আচরণ করেছে।

টিপাইমুখে বাঁধ দেওয়ার প্রতিবাদে দেশব্যাপি আন্দোলনের ডাক দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম পীর সাহেব চরমোনাই। তিনি প্রথমে জেলা জেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেন।এরপর প্রতিটি থানায় বিক্ষোভ মিছিল করে দেশবাসীকে সচেতন করেন।এরপর ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও করেন।সর্বশেষে তিনি ২০০৯ সালের ২৪,২৫,২৬ ডিসেম্বর তিন দিন ব্যাপি ভারতের টিপাইমুখ অভিমুখে লংমার্চ ঘোষণা করেন।ঢাকার মুক্তাঙ্গন থেকে লাখ লাখ জনতার লংমার্চ শুরু হয়ে সিলেটের জকিগঞ্জ পাটগ্রামে গিয়ে তিন দিন ব্যাপি ঐতিহাসিক লংমার্চ সমাপ্তি ঘোষণা করে লংমার্চ নেতা পীর সাহেব চরমোনাই। সেই লংমার্চে আওয়ামী লীগ আর জামায়াত ছাড়া সকলের দলের সমর্থন ও অংশগ্রণ ছিল।মাওলানা ভাষাণীর লংমার্চে বাংলাদেশ সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকলেও ২০০৯ সালে পীর সাহেব চরমোনাই টিপাইমুখ অভিমুখের লংমার্চে আওয়ামী লীগ সরকারের কোন ধরণের সহযোগিতা ছিলনা।

দেশের স্বার্থে যেহেতু লংমার্চ সেহেতু সরকারের উচিত ছিল লাখ লাখ জনতার খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনের মেটানো।কিন্তু সরকারের আচরণ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।পীর সাহেব চরমোনাইর টিপাইমুখ অভিমুখে লংমার্চের পর ভারত সরকার টিপাইমুখে বাঁধ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।এতেই প্রমাণিত হয় আলেম উলামা দেশপ্রেমিক ও ইসলামপ্রেমি।তিন লংমার্চ নেতার মধ্যে দুইজন আজ মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে।

এখনো সিংহের গর্জন দিচ্ছেন পীর সাহেব চরমোনাই। বাবরী মসজিদ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কিত রায় আর বিতর্কিত চুক্তির বিরুদ্ধে আবারো ভারত অভিমুখে লংমার্চ করতে পারে বাংলার জিন্দা শাহা জালাল মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম পীর সাহেব চরমোনাই।দোয়া ও শুভকামনা অন্তহীন।

লেখকঃ নুর আহমদ সিদ্দিকী