মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান
উত্তরা নিউজ


ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন; আওয়ামী লীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ






বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগের সূচনা হয়েছিল যে বাড়িটি থেকে, ঢাকার টিকাটুলি এলাকার কেএম দাস লেনে স্বগর্বে দাঁড়িয়ে আছে নান্দনিক সেই স্থাপনাটি- ‘রোজ গার্ডেন প্যালেস’।

ইতিহাস ঐত্যিহ্যের সাক্ষী হয়ে থাকা এই বাড়িটি শিগগিরই ঢাকা জাদুঘরের রূপ পাচ্ছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় থাকা এই স্থাপনাটির মালিকের কাছে থেকে গত বছর কিনে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। আওয়ামী লীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাড়িটির ইতিহাস, ঐতিহ্য আর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোঁজ নিয়েছে রাইজিংবিডি ডটকম।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িটিতে যেন প্রাণ নেই। কালের সাক্ষী হয়ে থাকা এই ভবনটি বছরজুড়ে নীরবে পড়ে থাকলেও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এলে কিছু নেতা-কর্মীরা খোঁজ নেন রোজ গার্ডেনের। এছাড়া বাড়িটির নির্মাণশৈলী দেখতে পর্যটকরা সারা বছরই আসেন এখানে। তারা খুঁজে ফেরেন ভবনটির গৌরবোজ্জল ইতিহাসকে।

রোজ গার্ডেনের দায়িত্বে থাকা মালি আবদুল মান্নান রাইজিংবিডিকে জানান, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ সেখানে গিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে মুরাদ রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম, যেখান থেকে দলের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল, সেখানো কোনো অনুষ্ঠান করা যায় কি না। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেখানে অনুষ্ঠান করা হচ্ছে না।’

কে গড়েছিলেন নান্দনিক এই স্থাপনা :
ইতিহাস ঘেটে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বিট্রিশ আমলে ঋষিকেশ দাস নামের একজন ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন। তবে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসায় ঢাকার খানদানি পরিবারগুলো তেমন পাত্তা দিত না ঋষিকেশ দাসকে। কথিত আছে যে, একবার তিনি জমিদার নারায়ণ রায় চৌধুরীর বাগানবাড়ি বলধা গার্ডেনের এক জলসায় গিয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরপরই তিনি রোজ গার্ডেন প্যালেস তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৩১ সালে পুরান ঢাকার ঋষিকেশ দাস রোডে একটি বাগানবাড়ি তৈরি করা হয়। বাগানে প্রচুর গোলাপ গাছ থাকায় এর নাম হয় রোজ গার্ডেন।

যেভাবে রোজ গার্ডেনে আ.লীগের জন্ম : 
অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও তরুণ মুসলিম লীগ নেতাদের উদ্যোগে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরনো ঢাকার কেএম দাস লেনের বশির সাহেবের রোজ গার্ডেনের বাসভবনে একটি রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধীদল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতা-কর্মীরা সংগঠন থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন আওয়ামী মুসলিম লীগ। প্রথম সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন প্রথম কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক।

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘কোথাও হল বা জায়গা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি রোজ গার্ডেনের সম্মেলনের সিদ্ধান্ত হয়। সেদিনের সে সম্মেলনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকসহ তৎকালীন রাজনৈতিক নেতারা রোজ গার্ডেনে উপস্থিত ছিলেন। সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন, তার নাম দেওয়া হল-পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে।’

রোজ গার্ডেনের ইতিহাস : 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, রোজ গার্ডেনের ভবনটি সজ্জিতকরণের কাজ সমাপ্ত হওয়ার আগেই ব্যবসায়ী ঋষিকেশ দাস আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যান। ১৯৩৭ সালে তিনি রোজ গার্ডেন প্যালেসটি খান বাহাদুর আবদুর রশীদের কাছে বিক্রয় করে দিতে বাধ্য হন। প্রসাদটির নতুন নামকরণ হয় ‘রশীদ মঞ্জিল’। মৌলভী কাজী আবদুর রশীদ মারা যান ১৯৪৪ সালে, তার মৃত্যুর পর রোজ গার্ডেনের মালিকানা পান তার বড় ছেলে কাজী মোহাম্মদ বশীর (হুমায়ূন সাহেব)। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে ১৯৭০-এ বেঙ্গল স্টুডিও ও মোশন পিকচার্স লিমিটেড রোজ গার্ডেন প্যালেসের ইজারা নেয়।  ‘হারানো দিন’ নামের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের শুটিং এই বাড়িতে হয়েছিল। এ কারণে সে সময় ভবনটি ‘হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৮৯ সালে রোজ গার্ডেনকে সংরক্ষিত ভবন হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু আদালতে মামলা করে ১৯৯৩ সালে মালিকানা স্বত্ব ফিরে পান কাজী আবদুর রশীদের মেজ ছেলে কাজী আবদুর রকীব। ১৯৯৫ সালে তার প্রয়াণ হয়।

রোজ গার্ডেন এখন সরকারের :
ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন গত বছর কিনে নেয় বাংলাদেশ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে সম্পত্তির বর্তমান মালিক ও তার সন্তানদের কাছ থেকে এ সম্পত্তি ক্রয়ের রেজিস্ট্রিকৃত দলিল গ্রহণ করেন।

‘সরকারি ক্রয় আইন’ অনুযায়ী ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকার বিনিময়ে বর্তমান মালিকের কাছ থেকে এ স্থাপনাটি কেনা হয়। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এটিকে একটি জাদুঘরে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ সময় প্রধানমন্ত্রী একটি চেক এবং ঐতিহাসিক ভবনের বিনিময়ে রোজ গার্ডেনের মালিককে নগরীর গুলশানে ২০ কাঠা জমিসহ একটি একতলা ভবন বিক্রির একটি রেজিস্ট্রিকৃত দলিল হস্তান্তর করেন।

ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুরান ঢাকার ইতিহাস তুলে ধরতে ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনকে জাদুঘরে পরিণত করা হবে। রোজ গার্ডেনের একটি ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে।  কেননা দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন এখান থেকেই যাত্রা শুরু করে।

তিনি বলেন, এই দলের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে। এই ঐতিহাসিক ভবনটি যথা যথভাবে সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন স্থাপনা নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। সরকার এর আগে নগর ভবনে একটি জাদুঘর স্থাপন করেছে। তবে এখন সেই জাদুঘরটি রোজ গার্ডেন ভবনে স্থানান্তর করা হবে। তিনি ভবনটির মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে এটি সংস্কার করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।

কি আছে রোজ গার্ডেনে : 
রোজ গার্ডেনের মালি আবদুল মান্নান জানান, প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা জমির ওপর এখন অবস্থান রোজ গার্ডেনের। ভবনটির মোট আয়তন সাত হাজার বর্গফুট। উচ্চতায় পঁয়তাল্লিশ ফুট। ছয়টি সুদৃঢ় পিলারের এই প্রাসাদটি স্থাপিত। প্রতিটি পিলারে দারুণ কারুকাজ। প্রাসাদটির স্থাপত্যে করিন্থীয়-গ্রীক শৈলী অনুসরণ করা হয়েছে।

রোজ গার্ডেনের গেট দিয়ে প্রবেশ করলেই দেখা মিলবে একাধিক পাথরের মূর্তি। রয়েছে ফোয়ারা। ভবনটি সামনে রয়েছে বড় পুকুর আর ইমারত দিয়ে তৈরি ঘাট। তবে রোজ গার্ডেনের মূল ভবনটির ভেতরে এখন আর কাউকে প্রবশে করতে দেওয়া হয় না।

রোজ গার্ডেনের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মালি সাইদুল ইসলাম রাসেল জানান, মূল ভবনের দ্বিতীয় তলায় পাঁচটি কামরা আর একটি বড় নাচঘর আছে। নিচতলায় আছে আটটি কামরা। রোজ গার্ডেন প্যালেসের পশ্চিম ও উত্তর দিকের দেয়ালের মধ্যবর্তী অংশে দুটি মূল ফটক আছে। প্রবেশ ও বহির্গমনের জন্য স্থাপিত পশ্চিম দিকের ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে প্রথমেই আছে একটি বিস্তীর্ণ খোলা প্রাঙ্গণ। এখানে মঞ্চের ওপর দণ্ডায়মান নারী মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। পুকুরের পূর্বদিকে আছে পশ্চিমমুখী একটি দোতলা ইমারত যার বর্তমান নাম ‘রশিদ মঞ্জিল’।  এখানে থাকতেন এর মালিক।

রোজ গার্ডেন থেকে আধুনিক কার্যালয়ে আ.লীগ : 
রোজ গার্ডেনে জন্ম নেওয়া আওয়ামী লীগ এখন দীর্ঘপথ  পরিক্রমায় পেয়েছে স্থায়ী আধুনিক কার্যালয়। রোজ গার্ডেনের দলটির গঠনের পর এর কার্যালয় ১৯৫৬ সালে পুরান ঢাকার ৫৬, সিমসন রোডে স্থানান্তর হয়। এভাবে ১৯৬৪ সালে ৯১ নবাবপুর রোডে, এরপর সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলের গলি, পুরানা পল্টনে কার্যালয়ের স্থান স্থানান্তরিত হয়েছে কয়েকবার। এরপর যায় সার্কিট হাউস রোডে। ১৯৮১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের হাল ধরলে নানা বিবেচনায় ঠিকানা হয় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ।

২০১১ সালে নতুন কার্যালয়ের পরিকল্পনা মাথায় আসে আওয়ামী লীগ নেতাদের। সরকারি বিধি অনুযায়ী নানা কার্যক্রমের পর ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভবন নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কাজে হাত নেওয়া হয়। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে দশতলা আধুনিক কেন্দ্রীয় কার্যালয় পেয়েছে দলটি। সূত্র: রাইজিং বিডি