এ সময়ের জনপ্রিয় শিল্পী ইমন খানের বাস্তব জীবনের গল্প


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ২১ নভেম্বর ২০১৯ - ১১:৫৬:০১ পূর্বাহ্ন

মারুফ সরকার, বিনোদন প্রতিনিধি: আজো প্রতি রাত খ্যাত’ কণ্ঠশিল্পী ইমন খান বর্তমান সময়ের ব্যস্ত সঙ্গীত শিল্পীদের একজন। প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে গান নিয়ে। প্রতিদিনই তাকে নতুন গান কন্ঠ তুলতে হচ্ছে। আজ ভয়েস দিতে হচ্ছেতো কাল মিউজিক ভিডিওর শুটিঙ্গের প্রয়োজনে ক্যামেরার সামনে দাড়াতে হচ্ছে। এই ব্যস্ততার মাঝেই কথা হয় জনপ্রিয় এই গায়ক সাথে ।তিনি বলেছেন নিজের ছোটবেলার কথা, বেড়ে ওঠার কথা, গান নিয়ে পথচলার কথা। আমাদের আজকের এই আয়োজনটি শুধু মাত্র ইমন খানের ভক্তদের জন্য সাজানো হয়েছে । চলুন জেনে নেই ইমন খানের সুখ দু:খের কিছু কথা ।

অনেক বছর আগের কথা, সময়টা ছিল সিডি এবং টেপ রেকর্ডারের। সেসময় একটি বাংলা গান বাংলাদেশের শহরে, গ্রামে, নর্গ বন্দরে, আনাচে, কানাচে ভীষণভাবে ছড়িয়ে গিয়েছিল। মানুষের মুখে মুখে ফিরছিল গানটি। বিয়ে বাড়ি থেকে খেলার মাঠ, খেলার মাঠ থেকে শোবার ঘর সবজায়গাতেই গানটি এককভাবে রাজত্ব করে যাচ্ছিল। গানটির হলো, ”আজও প্রতিরাত জেগে থাকি তোমার আশায়/তুমি চলে গেছ তাই বিরহের গান গাই, ঘুম নেই দুটি চোখে বুকের ব্যাথায়”। গানটি যে গেয়েছিল সেই শিল্পীটাও তখন নতুন। তার নাম ইমন খান। এর আগে তেমন কেউ তার নাম শোনেনি।

তবে ইমন খান নতুন হলেও তার গানটাকে মানুষ যেমন আপন করে নিয়েছিল তেমনই তাকেও প্রিয় শিল্পী করে নিয়েছিল অনেকেই। ফলে গানটির সাথে সাথে ইমন খানও হয়ে উঠলেন দেশের ও শিল্পী সমাজের পরিচিত মুখ। ঘটনাটি ২০০৮ সালের। আজো প্তরতিরাত গান দিয়ে ২০০৮ সালে ইমন খান মানুষের নিকট পৌঁছানোয় অনেকেই মনে করেন এটাই হয়তো ইমন খানের প্রথম গান ছিল।একদমই কিন্তু তা না! ২০০৮ সালে আজো প্রতিরাত দিয়ে ইমন মানুষের নিকট পৌছালেও এই অ্যালবামটি ইমনের পঞ্চম অ্যালবাম। ২০০৬ সালে সংগীতংগনে যাত্রা শুরু করা ইমন খানের প্রথম অ্যালবামের নাম ছিল আমার নাইরে আপনজন। এরপর সাধের ময়নারে, কষ্টের নদী প্রভৃতি৷ অতঃপর ২০০৮ সালে আজ প্রতিরাত দিয়ে কাংখিত সাফল্য খুজে পান বাংলা সঙ্গীতের বর্তমান জনপ্রিয় গায়ক ইমন খান।

আজো প্রতিরাতের পরে ইমন বেশকিছুদিন আরও কিছু গানও উপহার দিলেন শ্রোতাদের। এরপর হঠাৎ করেই ইমন খানের আর সাড়া নেই। সবাই ভাবলো ইমন খান বুঝি হারিয়েই গেলেন! এভাবে কেটে গেল বেশ ক’বছর। ততদিনে প্রযুক্তির আগ্রাসনে অবসান ঘটেছে সিডি ও টেপরেকর্ডারের। গান শোনার জন্য এসেছে নতুন মাধ্যম যা সংগীতংগনকে করে দিয়েছে টাল মাটাল। থিক এই মুহূর্তে ইমন খানের হঠাৎ নিরব হয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনিও এই টালমাটাল সময়কেই দায়ী করলেন। ইমন খান জানালেন তিনি যে নিরব ছিলেন বা গান থেকে দূরে ছিলেন কথাটা একেবারেই ঠিক না। বরাবরের মতো তখনো তিনি ইদ ও বৈশাখে নিয়মিত অ্যালবাম করে আসছিলেন। তবে সিডি যুগের অবসান এবং অনলাইন মাধ্যমে গান বিপননের কারণে শিল্পী সমাজ ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ধোয়াশায় রয়েছে তখন ইমনও একই দশা ছিল। আর অনলাইন মাধ্যম তখনও সবার কাছে এত সুলভ না হওয়াতেই হয়তো তার গান সেসময় শ্রোতাদের নিকট পৌছায়নি বলে দাবী ইমন খানের।

সময়ের তামাশায় শ্রোতাবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ইমন খানের আবার শ্রোতাদের নিকট ফিরে আসতে বেশকিছুদিন লেগে গিয়েছিল। কারণ অ্যালবামের যুগের শিল্পী একসাথে আট দশটি গান করে অভ্যস্ত ইমন খানের ইউটিউবে মাত্র একটি গান নিয়ে শ্রোতাদের সামনে হাজির হতে তার যেন মন টানছিল না। কিন্তু ইমনের কাছের মানুষ ও শুভাকাঙ্ক্ষীগণও চাইছিলেন ইমনের প্রত্যাবর্তন। আর এদের প্রতিনিয়ত অনুরোধ শুনতে শুনতে ইমনেরও মনে হলো, একসময় যে শ্রোতারা সিডিতে তার প্রতিরাত গান শুনেছে তারাইতো এখন ইউটিউবে গান শোনে।গান শোনার মাধ্যম পরিবর্তন হলেও শ্রতাত একই। ইমনের মনে প্রশ্ন জাগলো, “আচ্ছা, সেই ইমন খানকে কি এখনও মনে রেখেছে তারা?”

আর এই প্রশ্নের উত্তর খুজতেই সিডি চয়েস মিউজিকের ব্যানারে সাবরিনা সাবার সাথে “জানলে জানুক পৃথিবী” শিরোনামের একটি গান নিয়ে ইউটিউবে হাজির হলেন ইমন খান। আর তার এই প্রত্যাবর্তন অন্য কোনো কারণে নয়৷ তার এই প্রত্যাবর্তন ছিল শুধুমাত্র একটি প্রশ্নের উত্তর খুজতে। হ্যা, প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলেন ইমন খান। ইউটিউবে ইমন খানের গানের দর্শক সংখ্যাই ইমন খানকে জানিয়ে দিল শ্রোতারা তাকে এখনও ভোলেনি। এরপর আর থেমে থাকা হয়নি ইমন খানের। এরপর তিনি নিয়ে আসেন ভুল মানুষের ঘর, যে গানটি এখন এক কোটির ঘরে বসবাস করছে। এরপর একটা মানুষ, রুপা আমি ভাল নেই, দু চোখ ভরা জল, ধ্বংস, এভাবে একের পর এক নতুন নতুন গান নিয়ে আসতে লাগলেন। আর শ্রোতরাও গানগুলো লুফে নিতে লাগলো। ফলে ইউটিউবে গানগুলোর ভিউয়ের ঘরও নিমেষেই হয়ে যেতে লাগলো মিলিয়নের কোটায়। ফলে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানেরও লক্ষ হয়ে উঠলো ইমন খান। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি তাকে। তারই ফলস্বরুপ বর্তমানে তিনি এদেশের ১০ জন ব্যস্ততম গায়কদের একজন।

প্রতিদিনই রয়েছে তার ব্যস্ততা। আর এই ব্যস্ততার সবটুকুই হলো গান নিয়ে। আজ কন্ঠ দিতে হচ্ছেতো, কাল শুটিংয়ে যেতে হচ্ছে। আর এই শুটিংয়ের কথা বলতেই জানা গেল তিনি এখন আর গায়কের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই, পাশাপাশি অভিনয়ও করতে হচ্ছে তাকে। কেননা নিজের মিউজিক ভিডিওতে নিজেকেই মডেল হিসেবে থাকতে হচ্ছে তাকে। মিউজিক ভিডিওর কথা আসতেই ইমন খানের কাছে জানতে চাইলাম, আজকাল মিউজিক ভিডির বাজার এতটাই জমে গিয়েছে যে দেশের প্রথম সারির শিল্পীদের গান শুনেও মনে হয় গানের জন্য না, মিউজিক ভিডিওর জন্যই গান করছেন তারা। ইমন খানও কি তাই করছেন? উত্তরে ইমন খানের দৃড় জবাব, ‘না গানটাই আমার কাছে আসল। মিউজিক ভিডিও না। একটি ভাল গানের জন্য একটি লিরিক্যাল ভিডিওই যথেষ্ট। যেহেতু ইউটিউবে গান দেয়ার ক্ষেত্রে ভিজিুয়াল কন্টেন্ট প্রয়োজন সে জন্যই মিউজিক ভিডিও করা। তবে সেজন্য বজেট না, প্রয়োজন গানের সাথে গল্পের সামন্জস্যতা৷’

আজকাল অনেক বিগ বাজেটের এবং দেশের প্রথম সারির কন্ঠশিল্পীদের মিউজিক ভিডিওতে দেখা যায়, গানের সাথে গল্পের মিল নেই৷ গান একদিকে যাচ্ছেতো গল্প আরেকদিকে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ইমন খান কিন্তু কন্ঠশিল্পীদের দোষ একেবারেই দিলেন না। ইমনের মতে এটা নির্মাতার। কেননা ভিডিওটা গায়ক গায়িকা বানান না, ভিডিও নির্মাতা বানান। অতএব গানটি শিল্পী এজন্য নির্মাতাকে দিয়ে দেন। এখন তিনি যদি গানকে এড়িয়ে ভিডিও নির্মাণ করেন সেক্ষেত্রে গায়কের আর কিইবা করার থাকে?

কথার প্রসংগে উঠে আসে, ইমন খানের প্রত্যাবর্তনে অনেক কন্ঠশিল্পীরই প্রসার থেমে গেছে। এর কারণ কি? এ ব্যাপারে ইমন খানের সোজাসাপ্টা উত্তর। ইমনের মতে শ্রোতাদের চাহিদা পূরণে তারা ব্যার্থ। তাই হয়তো শ্রোতারা তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। একসময় ইউটিউবে অনীহা থাকা ইমন খান এখন ইউটিউবে নিজের গান দিয়ে রাজত্ব করছেন। কিন্তু আগে সিডির কালে প্রতিযোগিতাটা ছিল দেশীয় শিল্পীদের সাথে আর এখন প্রতিযোগিতাটা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড। এক্ষেত্রে ইমন মনে করেন এখন ইউটিউবে টিকে থাকতে হলে থাকতে হবে নিজের মেধা। সেটা যার আছে সেই থাকবে আর যার নেই সে হারিয়ে যাবে।

ইমন খান ভালবাসেন মনির খানের গান। একজন শ্রোতা হিসেবে তিনি মনির খানের ভক্ত। তবে প্রিয় শিল্পীদের মতো তারও একটি নিজস্ব ফ্যান ফলোয়ার তৈরি হয়েছে। সেসব ফ্যানদের সাথে দেখা হলে ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত রোমাঞ্চকর ঘটনা। এরকম কোনো মজার ঘটনা জানতে চাইলে ইমন জানান এমন ঘটনা প্রতিনিয়তই তার সাথে ঘটে। আজও তিনি এখানে আসার সময় একটি ছেলে তার পিছু নিয়েছিল। পরে ইমন খান বিষয়টা খেয়াল করে বুঝতে পারলেন ছেিেল্ট তার সাথে একটা বার কথা বলতেই তাকে ফলো করছে। ইমন খানের সামনে এসে ছেলেটি জানতে চাইছিল তিনি ইমন খান কি না। ইমন খান হ্যা বলার পর খেয়াল করলেন আবেগে আপ্লূত ভক্তটি ইমন খানকে জড়িয়ে ধরে উত্তেজনায় কাঁপছে! অসংখ্য ভক্ত শ্রোতার অধিকারী ইমন খান সঙ্গীতঙ্গনের কাউকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন না।বরং সবার সাথে মিলে মিশে কাজ করতে চান তিনি।

ব্যাক্তিগত জীবনের কথা বলতে গেলে আজকের গানের মানুষ ইমন খান ছোট বেলা থেকেই গানপাগল ছিলেন৷ কিন্তু পরিবারের কেউ গানের সাথে জড়িত না থাকায় এবং বাবা এসব পছন্দ না করায় প্রতিবন্ধকতা আসলেও ডানপিটে ইমন সেসব গ্রাহ্য করেননি। তবে উৎসাহ পেয়েছেন বন্ধু বান্ধব এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিকট। আর একজন মানুষ তাকে সবসময় নিরবে উৎসাহ দিয়ে গিয়েছেন যার প্রেরণা ইমনকে যুগিয়েছে এগিয়ে যাওয়ার সাহস, তিনি হলেন ইমন খানের মমতাময়ী মা।সেদিনের সেই ছোট্ট ইমন খান মায়ের উৎসাহ, অনুপ্রেরনা আর বন্ধুদের ভালবাসাকে পুজি করেই এতটা পথ আসতে পেরেছেন, হতে পেরেছেন আজকের ইমন খান। সে সময় গানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও তিনি নিয়েছেন। উল্লাপাড়া শহীদ বীরেন স্মৃতি সংগীত একাডেমির ছাত্র ছিলেন ইমন।

বর্তমান সময়ের ব্যস্ত গায়ক ইমন খান এখনও পরিবার থেকে আন্তরিক উৎসাহ পান তবে পাশাপাশি তার সমালোচকও এখন রয়েছে তার পরিবারে। আর তারা হলো ইমনের দুই সন্তান। বাবা বলে বাবার গানের প্রতি বিন্দুমাত্র স্বজনপ্রীতি করে না ছেলেরা। বাবার যে গানটা ভাল লাগে তাকে ভাল বলে এবং বাবার যে গান তাদের ভাল লাগেনা সেটাও তারা বাবাকে বলে দেয়। আর একসময় যে অনুপ্রেরণাটা দিতেন তার মা এখন সেই অনুপ্রেরণা দিয়ে তাকে সাহস জোগান তার স্ত্রী।

আজন্ম গানের মানুষ ইমন খানের গান নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান আজীবন গানের সাথেই কাটিয়ে দিতে চান এই গায়ক।