একুশে ফেব্রুয়ারি ও কিছু প্রসঙ্গ কথা


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ - ০৮:২৪:৫৩ অপরাহ্ন

একুশে ফেব্রুয়ারি সর্ম্পকে বলতে গেলেই প্রথমেই যে সব সূর্য সন্তানদের কথা, যারা মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় অকাতরে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। নিজের রক্তে রঞ্জিত করেছেন পিচ ঢালা কালো রাজপথ। অবশেষে, মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিশ্বপরিমন্ডলে। তাঁরা আর কেউ নন-তাঁরা আমাদেরই ভাই, রফিক, জব্বার, বরকত, সালাম, শফিউরসহ নাম না জানা আরো অনেকেই।

মুজিব শতবর্ষে দাঁড়িয়ে ভাষা দিবসের কথাবলতে লেখার শুরুতেই তাঁদের জানাই, লাল সালাম, রক্তিম শুভেচ্ছা। সালাম এবং রক্তিম শুভেচ্ছা জানাই, ইতিহাসের মহানায়ক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি, যিনি মাতৃভাষার ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ব্যাপক অবদান রেখে গেছেন, ভাষা চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তাঁরা এ অবদান না রাখলে হয়ত আজ আমরা মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারতাম না। আমরা বিশ্বাস করি, বাঙালি বীরের জাতি, বারবার এজাতি মা-মায়ের ভাষা-মাটি এবং মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য আত্মউৎসর্গ করেছেন। এ প্রথিবীতে দ্বিতীয় কোন জাতি খুঁজে পাওয়া যাবেনা, যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে।

১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনের জাঁতাকল থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর, পাকিস্তান ধর্মীয় সাদৃশ্যের অযুহাতে, বাংলাকে হিন্দুদের ভাষা বলে আমাদের মাতৃভাষাকে কেড়ে নিয়ে কূটকৗশলে উর্দ্দূকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াস চালিয়েছিল। কিন্তু বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা সেদিন তাতে প্রতিবাদ জানায়। ১৯৪৮ সালের গোড়ার দিকেই মূলত ভাষা আন্দোলনের যাত্রা শুরু এবং বায়ান্নতে এসে নতুন মাত্রা যোগ হয়। কারণ, বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পুলিশের গুলিতে জীবন দেয় সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা আরো অনেকে।

তাঁদের এ জীবনদান বাঙালীর জাতীয় জীবনে নবচেতনার উম্মেষ ঘটায়, এমনকি বাংলা ভাষা, সমগ্র পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে যা বাঙালি জাতিকে স্বাধিকার আন্দোলনে উদ্ভুদ্ধ করে। মূলত: একুশের চেতনা, বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উপনীত হতে প্রেরণা যুগিয়েছিল। সেই প্রেরণা থেকেই বীর বাঙালি ১৯৭১ সালে ন’মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের মধ্যদিয়ে, ৩০ লক্ষ শহীদের জীবনদান আর ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। তাই একুশ ছিল বাঙালি জাতির শত সংগ্রামের সকল প্রেরণার উৎস এবং শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ অর্জন।

আজ সেই গৌরবময় একুশে ফেব্রুয়ারি, যা কালক্রমে বিশ্বের দরবারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এক্ষেত্রে যে দু’জন বাঙালির অবদান স্বীকার না করলেই নয়- তাঁরা হলেন, জনাব রফিকুল ইসলাম এবং জনাব আবদুসালাম। এ দু’জন বাঙালি কানাডার ”The Mother Language Lover of the World” নামে একটি সংগঠনের সাথে সংপৃক্ত ছিলেন। সর্বপ্রথম, তাঁরাই উক্ত সংগঠনের কতিপয় বিদেশী সদস্য নিয়ে, একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য জাতিসংঘের মহাসচিবের নিকট আবেদন করেন। মহাসচিব তা ইউনেস্কোতে পাঠিয়ে দেন।

সেখান থেকে জানানো হয়, কোন সংগঠনের পক্ষ থেকে নয়, কোন সদস্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর প্রস্তাব আসতে হবে। তখন তৎকালীন এবং বর্তমান সরকার প্রধান, বিশ্বনেত্রী, দেশরত্ন শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়টি ইউনেস্কোতে প্রস্তাব আকারে উপস্থাপন করলে, ইউনেস্কো তা সাদরে গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ অধিবেশনে ১৮৮টি সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে ঘোষণা দেয়। তাই একুশ আজ আর কেবল বাঙালিরই নয় বরং সমগ্র বিশ্বের গর্ব-অনুপ্রেরণার উৎস। জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত সকল দেশেই আজ এ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

ভাষা শহীদদের অর্জন শ্রেষ্ঠ, কিন্তু আমাদের সংরক্ষণ তৎপরতা অপ্রতুল। ভাষা শহীদের উত্তরসূরি হিসেবে এটি আমাদের জন্য লজ্জার এবং আমার ভাইয়ের রক্তের অবমাননা। একবার আরবি হরফে বাংলা লেখা চালু করার ষড়যন্ত্রও করেছিল পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠি, কিন্তু পারেনি। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, ভাষা সৈনিকদের বাংলায় ইংরেজি হরফে ফেসবুকে বাংলা চলে, মাতৃভাষার প্রতি আমাদের এ হচ্ছে ভালোবাসা। বাণিজ্যের কারণেও রেডিও এবং টেলিভিশনে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলার সাথে ইংরেজি বা অন্যান্য শব্দ মিশিয়ে উপস্থাপনাকে অলঙ্কৃত করার মধ্য দিয়ে বাংলাকে কলঙ্কিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন, সকল পাঠ্যপুস্তক বাংলা ভাষায় রচিত হবে এবং সে লক্ষে বাংলা একাডেমিও প্রতিষ্ঠা করে তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তা আর তেমনভাবে এগোয়নি। লক্ষ করা গেছে, ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থীরা বাংলা তেমন বুঝে না, বাংলা পরীক্ষায় তারা খারাপ করে। এটা কোনভাবেই কাম্য নহে। ইংরেজি জানতে হবে, কিন্তু কোনভাবেই মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। একাধিক ভাষা শিখলে জ্ঞানের পরিধি বাড়বে ঠিক আছে, কিন্তু মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে নয়। তাই মাতৃভাষা ভালো করে জানে এমন লোককেই অন্য ভাষা শিখার সুযোগ দেয়া উচিত, নচেৎ নয়। আজকাল সকলেই সাইনবোর্ড, পথ নির্দেশিকা, সড়ক ও বাড়ির নম্বর ইংরেজিতে লিখতে শুরু করেছে। পর্যটকদের সুবিধার্থে বাংলার নিচে ছোট করে ইংরেজি লেখা থাকতে পারে, কিন্তু বাংলা বাদ দিয়ে নয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে।

তবে আশার কথা হচ্ছে, ক) বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির জন্য জাতির জনক যেমন বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাঁর সুযোগ্য তনয়া, দেশরত্ন শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মানের মাতৃভাষা ইনিষ্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছেন, খ) ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন, গ) বাংলায় দেয়া বঙ্গবন্ধুর ০৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো কর্তৃক ঐতিহাসিক প্রামানিক দলিল হিসেবে গৃহিত হয়েছে, ঘ) আজ বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি লোক বাংলায় কথা বলে, ঙ) বিশ্বের প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভাষার মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলা বিশ্বের ৪র্থ বৃহৎ মাতৃভাষা এবং চ) ২০১৯ সালে এ দিবসটিকে নিউইর্কের গর্ভনর বাংলাদেশি ইমিগ্রেন্ট-ডে হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এগুলো মাতৃভাষা বাংলার প্রতি মর্যাদারই উল্লেখযোগ্য দিক।

বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি, সম্প্রসারণ ও সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের জন্য এখন প্রয়োজন, ক) বাংলা ভাষায় প্রচুর লেখা-লেখি করার সুযোগ সৃষ্টি করা, সরকারী উদ্যোগে লেখার সেই পরিবেশ তৈরী করতে হবে। প্রকাশের উদ্যোগ নিশ্চিত করলে লেখক সমাজ তৈরী হবে, এ দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে, খ) সংশ্লিষ্ট সকলকে সজাগ হতে হবে, যেন বাংলার সাথে অন্য কোন ভাষার মিশ্রণ না ঘটে, গ) বাংলায় ভালো ভালো লেখাগুলোকে বিশ্বের দরবারে পৌছাতে হলে মানসম্মত সাহিত্যগুলোকে একাধিক বিদেশী ভাষার অনুবাদ করতে হবে। বাংলা একাডেমীকে এর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে, প্রয়োজনে আলাদা বিভাগ খুলতে হবে, ঘ) পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় রচিত উন্নত সাহিত্য কর্মগুলো আমাদের জনগোষ্ঠির জন্য বাংলায় অনুবাদ করতে হবে। এ সমস্ত কাজের জন্যও আলাদা একাডেমিও হতে পারে, ঙ) বাংলাকে ইংরেজি লেটার দিয়ে এবং ইংরেজিকে বাংলা বর্ণ দিয়ে লেখা বন্ধ করতে হবে, চ) ফেসবুকে মন্তব্য লেখা, সাইন বোর্ড লেখা, রাস্তার নামকরণ, সড়কের নম্বর, মাইল ফলক লেখা, সরকারী অফিস আদেশ জারি, আদালতের রায় লেখা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলা প্রচলন জোরদার করতে হবে।

কঠোর নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা এবং তা যথাযথ বাস্তবায়নেরর মাধ্যমে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। দেখা যায়, একুশ এলেই কেবল আমরা ভাষা প্রেমিক হয়ে উঠি, তারপর ভুলে যাই। আমাদের সারা জীবনের জন্য মাতৃভাষা প্রেমিক হতে হবে। আমরা শিক্ষক, ছাত্র, ব্যবসায়ী সর্বস্তরের মানুষের উচিত সরকারী নির্দেশনার প্রতি সাড়া দিয়ে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের লক্ষে ভাষার মর্যাদা রক্ষায় কাঁদে কাঁদ মিলিয়ে কাজ করে যাওয়া। আসুন, আমরা সবাই তাই করি। ইনশাল্লাহ-আমরা সফল হবো। বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষা অন্যতম মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে, অবস্থান ধরে রাখবে।