উন্নয়নের এপিঠ-ওপিঠ

সমকালীন প্রসঙ্গ

» মোহাম্মদ তারেকউজ্জামান খান | সম্পাদক ও প্রকাশক | সর্বশেষ আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ১০:১০:২২ অপরাহ্ন

সব বছরেই বাজেট বক্তৃতায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট অর্জনের কথা শোনা যায়। আর শোনা যায় নির্বাচনী বক্তৃতায়। এ বছরেও বাজেট বক্তৃতায় এমনটি শোনা গিয়েছিল। বাজেট পাস হওয়ার আগে বিভিন্ন মহল থেকে প্রস্তাবিত বাজেটের কিছু রদবদলের কথাও শোনা যায়। বাজেট সংসদে অনুমোদন হওয়ার পরও বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। এরপর আর কিছু তেমন শোনা যায়নি। তবে এ বছর বাজেট সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া এখনও থামেনি। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে বাজেট ও উন্নয়নের সাফল্যের অন্যচিত্র সম্পর্কেও কিছু দৈনিকে খবর প্রকাশ করা হয়েছে। এ বছর বাজেটের আকার ছিল আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এ বছরের বাজেটের একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের। ১১ জুনের একটি দৈনিকে এটাই ছিল প্রধান খবর। তখন বাজেট সংসদে পেশ করা হয়নি। বাজেট পাস হওয়ার পর বিভিন্ন দৈনিকে বাজেট সংক্রান্ত সমালোচনা শুরু হয়। ১ জুলাই একটি দৈনিকের প্রধান খবরের শিরোনাম ছিল- ‘কোনো ছাড় পেল না মধ্যবিত্ত’। এ ছাড়া বলা হয়েছিল, বাড়ল ব্যবসার খরচ। ওইদিন সংশ্নিষ্ট দৈনিকে একজন অর্থনীতিবিদের বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়। তার ভাষায়, ২০১৯-২০ সালের বাজেটে মধ্যবিত্ত শ্রেণি উপেক্ষিত। এর সঙ্গে নিম্নবিত্তরাও। এর দুটি কারণ তিনি চিহ্নিত করেন। এক. সঞ্চয়পত্রের ওপর উৎস কর এবং দুই. কর কাঠামো নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এক কথায় ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা আঘাত পাবে।

বিশাল আকারের বাজেটের প্রয়োজন হয় উন্নয়নের জন্য। বাজেটের অর্থ জোগানোর জন্য কর বৃদ্ধি ও করদাতাদের সংখ্যাও বাড়াতে হয়। এ দুটি কাজই অত্যন্ত কঠিন। প্রথমটি রাজনৈতিক কারণে কঠিন। দ্বিতীয়টি যোগ্য করদাতা শনাক্ত করার কাজও কঠিন। দ্বিতীয়টির সমস্যা সমাধানে এ বছর সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর আরোপ করা হয়। এ ছাড়া অন্য একটি সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। সেটা হলো ইটিআইএন না দেখালে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে না। এমন সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা আছে কি-না, সে বিষয়ে ১ জুলাইয়ের একটি পত্রিকায় একজন অর্থনীতিবিদ যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার যুক্তি হলো, ইটিআইএন সবার থাকে না। ধনী ও মধ্যবিত্তদের থাকে, কিন্তু গরিবদের থাকে না। কারণ যোগ্য আয়করদাতা সংজ্ঞার বাইরে অর্থাৎ যাদের আয় আয়কর আইন দ্বারা নির্ধারিত আয়সীমার তুলনায় কম, তাদের জন্য কেন ইটিআইএন।

এ শ্রেণির ব্যক্তি কেন বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে! এ কথা সত্যি যে, আয়কর বিভাগ থেকে বারবার বলা হয়, কর আরোপযোগ্য আয় না থাকলেও ইটিআইএন গ্রহণ করতে কোনো বাধা নেই। যে কথাটি বলা হয়নি তা হলো, এ ক্ষেত্রে একটি নূ্যনতম আয়কর দিতে হবে। সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞের বক্তব্যে অন্য একটি অযৌক্তিক ক্ষেত্রও তুলে ধরা হয়। তা হলো, ডিজিটাল সেবার ওপর কর। তার মতে, এর ফলে শুধু মধ্যবিত্তই নয় বরং নিম্নবিত্তরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের জন্য এটা হবে বাড়তি ব্যয়। আজকাল মোবাইল ফোন যে গরিবরাও ব্যবহার করে সে বিষয়টি বলার অপেক্ষা রাখে না। বিকল্প হিসেবে সরকারের উচিত ছিল করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি করা। এ দাবি প্রতিবারের মতো এবারও বিভিন্ন মহল থেকে করা হয়েছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। অন্যান্য আবশ্যিক ব্যয়, যেমন- বাড়ি ভাড়া, পরিবহন ও চিকিৎসা ব্যয় আগের তুলনায় বাড়লেও এর কোনো কর অব্যাহতি নেই। অর্থাৎ বিদ্যমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির করদাতাদের অধিক হারে কর দিতে হবে অথবা তাদের বাড়তি ব্যয়ভার সহ্য করতে হবে। বাজেট হবে উন্নয়নের ধারক ও চালিকাশক্তি। অথচ অভূতপূর্ব উন্নয়নের কথা শোনার পরও মিডিয়ায় প্রকাশিত বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের বিশ্নেষণ অনুযায়ী গরিবদের জন্য বাজেট কার্যকরী পদক্ষেপের বিষয়টি শূন্যই বলা যায়। এ কথা সত্যি যে, ১৫ বা ২০ বছর আগের তুলনায় দারিদ্র্য বিমোচনে যথেষ্ট সাফল্য এসেছে।

বর্তমানে ২২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। তবে এটা হলো গড় হিসাব। কিছু জেলায় এ হার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। এক বিশেষজ্ঞের মতে, দারিদ্র্যসীমার হার হ্রাস করার ক্ষেত্রে বাজেটে কোনো আভাস নেই। সার্বিকভাবে তার অভিমত হলো, বাজেটে গুটি কয়েক পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল। এক. করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো; দুই. করপোরেট করহার হ্রাস করা; তিন. গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য কিছু সুবিধা দেওয়া; চার. দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্ব দেওয়া এবং পাঁচ. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানো।

২ জুলাই একটি দৈনিকে বর্তমান বছরের বাজেটের কয়েকটি নেতিবাচক ক্ষেত্রও চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘ভ্যাটের চাপ, গ্যাসের আগুন’। নতুন ভ্যাট আইনে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে রেকর্ড হারে বাড়ল গ্যাসের দাম। ফলে শিল্প খাতে চাপ সৃষ্টি হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন আয়ের মানুষ। অন্যদিকে আবাসিক পরিবহন খাতে ব্যবহূত রডে টনপ্রতি প্রভাব এক হাজার ৪৪০ টাকা হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। সুতার দাম বাড়বে কেজিতে আট টাকা। টাইলসে মিটারপ্রতি ব্যয় বাড়বে ১০ টাকা। উল্লেখ্য, একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন গবেষকও একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বাজেট সাধারণ সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

অর্থনৈতিক উন্নতির কথা আমরা বারবার শুনছি। শুনছি জিডিপির প্রবৃদ্ধির কথাও। এরপরও প্রশ্ন থেকে যায়। কিছুদিন আগেই অর্থনীতিবিদরা আয় বৈষম্যের কথা বলেছেন। এ ধরনের বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে বর্তমান বাজেট ও উন্নয়নের ধারা কতটুকু সহায়ক হবে, সে বিষয়টিও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। সর্বশেষ ১৭ আগস্ট একটি দৈনিকের প্রধান খবরের শিরোনাম ছিল- ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধি, স্বল্প সংখ্যক কর্মসংস্থান’। উপশিরোনামে বলা হয়েছে, উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কৃষি ও শিল্প খাত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংবাদে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের তথ্য সরকার পরিচালিত একটি গবেষণায় পাওয়া যায়। সম্প্রতি মিডিয়ায় প্রকাশিত অন্য একটি খবর ছিল, শতকরা ২৭ ভাগ যুবক প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত। দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের একটি সম্পর্ক রয়েছে। সরকারও এ ক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু তার পরও আশানুরূপ সুফল পাওয়া যায়নি। মিডিয়ায় এ ধরনের সংবাদ প্রকাশই এ প্রমাণ।

কর্মসংস্থানের বিষয়ে জানা গেছে, কৃষি ও শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের হার হ্রাস পেয়েছে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে দুটি বড় প্রকল্পে নির্মাণ খাতে ব্যয় যথেষ্ট হবে। এর ফলে নির্মাণ খাতে কিছু কর্মসংস্থান হলেও সার্বিকভাবে তা বেকার ব্যক্তিদের উপকারে আসবে না। এ সম্পর্কে একজন অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন, শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়ের জন্য কর্মসংস্থানের হার অশিক্ষিত সম্প্রদায়ের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে শিক্ষার জন্য বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ার কথা। অন্যদিকে জ্ঞানের সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক কর্তৃক সাম্প্রতিককালে অনুমিত জ্ঞানের সূচকে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিল্ফেম্ন। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি জ্ঞান সমৃদ্ধ সমাজ ও সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চীনে গত কয়েক দশকে জ্ঞান সমৃদ্ধ সমাজের বিকাশ ঘটায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহজ হয়েছে- এ কথা অস্বীকার করা যায় না। সম্পূর্ণ ব্যবসাবান্ধব বা বিত্তবানবান্ধব বাজেটে উন্নয়ন হবে হয়তো; কিন্তু সামাজিক উন্নয়ন ও জ্ঞান সমৃদ্ধ সমাজ হবে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা