উত্তরখানে চাঞ্চল্যকর সাকিব হত্যার ঘটনায় মূল হোতাসহ গ্রেফতার ৩

র‌্যাব-১ এর অভিযান

» উত্তরা নিউজ টোয়েন্টিফর, ডেস্ক রিপোর্ট | | সর্বশেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০১৯ - ০৬:৫১:৩৭ অপরাহ্ন

১৭ মে ২০১৯ ইং তারিখ র‌্যাব-১ এর অভিযানে রাজধানীর উত্তরখানে ছুরিকাঘাতে চাঞ্চল্যকর সাকিব (২০) হত্যা ও তার বন্ধু শিপন (১৯) কে গুরুতর আহতের ঘটনায় মূল হোতা মোঃ শাহীন @ ব্ল্যাক শাহীন (২৪)’সহ ০৩ জন গ্রেফতার ॥ হত্যার কাজে ব্যবহৃত রক্তমাখা সুইচ গিয়ার চাকু উদ্ধার।

গত ১৫ জুন ২০১৯ ইং তারিখ বিকাল আনুমানিক ১৭৩০ ঘটিকায় রাজধানীর উত্তরখান থানাধীন নদীর পাড় বাটুলিয়া এলাকায় কতিপয় ছিনতাইকারী উক্ত এলাকায় ঘুরতে আসা ভিকটিম মোঃ সাকিব হোসেন (২০)কে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে এবং তার বন্ধু মোঃ শিপন মিয়া (১৯)কে গুরুতরভাবে জখম করে পালিয়ে যায়। ছিনতাইকারীরা নিহত সাকিব হোসেন এর বুকে ও পিঠে ধারালো ছোড়া (সুইচ গিয়ার) দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে এবং শিপনের পিঠে গুরুতর জখম করে। বর্ণিত হত্যাকান্ডের ঘটনায় উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতনামা ৭/৮ জনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা রুজু করা হয়, যার নম্বর-১১ তারিখ ১৬/০৬/২০১৯ ইং, ধারা ৩০২/৩২৬/৩৪ দঃ বিঃ।

ভিকটিমের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায় যে, নিহত সাকিব হোসেন দুই ভাই-বোনের মধ্যে বড়। ছোট বেলায় তার মা মারা যাওয়ার পর তার পিতা সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আর বিয়ে করেননি। সাকিব হোসেন এসএসসি পাশ করার পর অর্থাভাবে পড়ালেখা বন্ধ করে দেয়। সে উত্তরার ৭নং সেক্টরে অবস্থিত “ফড়িং’ নামক পোশাক শো-রুমের একজন কর্মচারী ছিল। তার পিতা মোঃ রফিকুল ইসলাম পেশায় একজন রাজমিস্ত্রী। বার্ধক্য ও শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে বর্তমানে তিনি বেকার। নিহত সাকিব হোসেন ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার উপার্জনে পুরো পরিবার চলত। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তার পিতা বর্তমানে শোকে হতবিহবল হয়ে পড়েছে।

অপর আহত ভিকটিম শিপন মিয়া (১৯) পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে ২য়। তার বড় এক ভাই ও ছোট তিন বোন আছে। তার পিতা সুলতান মিয়া পেশায় একজন রাজমিস্ত্রী। এত বড় পরিবারের খরচ পিতার একার পক্ষে সংকূলাণ করা সম্ভব নয় বিধায় সে উত্তরাস্থ ৩নং সেক্টরের “সাইনটেক্স ‘ নামক একটি পোশাক শো-রুমে চাকুরী নেয় এবং পরিবারে আর্থিক যোগানে অংশ নেয়। তার মতে, ঘটনার দিনে ছুটি থাকায় দুই বন্ধু মিলে বাটুলিয়ায় নদীর পাড়ে ঘুরতে যায়। কিছুক্ষণ পর ৭/৮ জনের একটি দল তাদের গতিরোধ করে এবং তাদের নিকট হতে মোবাইল ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় তাদের বাঁধা দিতে গেলে ছিনতাইকারীরা ধারালো ছোড়া নিয়ে তাদের উপর্যুপরি আঘাত করে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার সাকিব হোসেনকে মৃত ঘোষনা করে। ভিকটিম শিপন বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০১ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে। তার অবস্থা বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত।

বর্ণিত হত্যাকান্ডের ঘটনাটি সারাদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়। এই নির্মম হত্যাকান্ডের প্রেক্ষিতে র‌্যাব-১ তাৎক্ষনিকভাবে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে দ্রুততার সাথে ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৭ জুন ২০১৯ তারিখ আনুমানিক ২০৩০ ঘটিকায় র্যা ব-১, উত্তরা, ঢাকা এর একটি আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে যে, বর্ণিত হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত কতিপয় ব্যক্তি রাজধানীর উত্তরখান থানাধীন বাটুলিয়া এলাকায় আত্মগোপন করে আছে। প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে আভিযানিক দলটি বর্ণিত স্থানে অভিযান পরিচালনা করে ১) মোঃ শাহীন মিয়া @ ব্ল্যাক শাহীন (২৪), পিতা- মোঃ আব্দুল মান্নান, মাতা- শাহানারা বেগম, বাড়ী নং-৩০৫, কোটবাড়ী, ডাকঘর- ফায়দাবাদ, থানা- দক্ষিণখান, ডিএমপি, ঢাকা, ২) মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম @ মিজু (২৪), পিতা- বিল্লাল হোসেন, মাতা- পারভীন বেগম, সাং- পুরাতন বাশকান্দা, থানা- বকশীগঞ্জ, জেলা- জামালপুর, বর্তমানেঃ সাং- কোটবাড়ি, থানা- দক্ষিণখান, ডিএমপি, ঢাকা এবং ৩) মোঃ ফরহাদ হোসেন (২৬), পিতা- মোঃ আওয়াল (ড্রাইভার), মাতা- মরিয়ম বেগম, সাং- ফায়দাবাদ চরেরটেক, ডাকঘর- ফায়দাবাদ, থানা- দক্ষিণখান, ডিএমপি, ঢাকা’দের গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃত আসামীদের দেওয়া তথ্যমতে উত্তরখান থানাধীন আটিপাড়ার পাশ্ববর্তী কাঠালতলা নামক স্থান হতে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ০১ টি সুইচ গিয়ার ধারালো ছোড়া উদ্ধার করা হয় এবং তাদের নিকট হতে ০৩ টি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আসামীরা বর্ণিত হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার কথা জানায়।

গ্রেফতারকৃত আসামী মোঃ শাহীন মিয়া @ ব্ল্যাক শাহীন’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় যে, সে ২০১৫ সালে সিরাজ উদ্দিন সরকার বিদ্যা নিকেতন, টঙ্গী হতে এসএসসি পাশ করার পর পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। সে দীর্ঘ দিন যাবৎ ইয়াবা ও গাঁজা সেবন করে আসছে বলে জানায়। পাশাপাশি সে ইয়াবা ও গাঁজা ব্যবসার সাথেও জড়িত। তার বিরুদ্ধে উত্তরখান ও দক্ষিণখান থানায় একাধিক ছিনতাই, মারামারি ও মাদক মামলা রয়েছে বলে জানা যায়। তার দেওয়া তথ্য মতে, হত্যাকান্ডের দিন সে এবং ধৃত অপর দুই আসামীসহ জিয়া, তানভীর, রুবেল, মিঠু, সবুজসহ ৭/৮ জন ঘটনাস্থলে ইয়াবা ও গাঁজা সেবন করছিল। এসময় মিঠু ভিকটিমদের দেখে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে সবাইকে নিয়ে তাদের নিকট গিয়ে গায়েপড়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। বাকবিতন্ডার একপর্যায়ে তারা ভিকটিমদের মোবাইল ও টাকা ছিনিয়ে নিতে চাইলে তারা বাঁধা দেয়। এসময় দুই পক্ষের হাতাহাতি হলে রুবেল তার নিকটে থাকা একটি সুইচ গিয়ার ছোড়া বের করে। এসময় শাহীন মিয়া রুবেলের নিকট হতে ছোড়াটি নিয়ে সাকিব ও শিপনকে উপর্যুপরি আঘাত করে পালিয়ে যায়।

গ্রেফতারকৃত আসামী মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম @ মিজু’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় যে, সে সিরাজ উদ্দিন সরকার বিদ্যা নিকেতন, টঙ্গী হতে নবম শ্রেনী পর্যন্ত পড়ালেখার করেছে। সে পেশায় বাইপাইল-সায়দাবাদ রুটে দোয়েল পরিবহনের হেল্পার। এর আগে সে আশুলিয়া বেড়ী বাঁধ এলাকায় ফ্লেক্সিলোড এর ব্যবসা করত। সে এই চক্রের সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। সে দীর্ঘদিন যাবৎ ইয়াবা ব্যবসার পাশাপাশি নিজেও ইয়াবা সেবন করে আসছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মাদক এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামল রয়েছে এবং এসব মামলায় সে কারাভোগ করেছে বলে জানায়।

গ্রেফতারকৃত আসামী মোঃ ফরহাদ হোসেন’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় যে, সে পেশায় একজন টিউবওয়েল মিস্ত্রী। সে এই চক্রের সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। সে প্রায় পাঁচ বছরের বেশী সময় ধরে মাদকাসক্ত। এছাড়াও সে দীর্ঘদিন যাবৎ ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। তার বিরুদ্ধে পাঁচটির বেশী মাদক মামলা রয়েছে এবং এসব মামলায় সে বেশ কয়েকবার কারাভোগ করেছে বলে জানায়। সে এই চক্রের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের নিয়মিত সহযোগী।

ধৃত আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদে এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায় যে, বর্ণিত এলাকায় এই ছিনতাই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। তারা উক্ত এলাকায় ঘুরতে আসা লোকদের অস্ত্রের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা-পয়সা, মোবাইল ইত্যাদি ছিনতাই করে আসছিল। এছাড়াও এই চক্রটির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, নারীর শ্লীলতাহানীসহ বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া যায়।