উত্তরা নিউজ উত্তরা নিউজ
অনলাইন রিপোর্ট


আমাজনের বিরাট জাগুয়ার বনমালা






প্রকৃতির অসাধারণ নিয়মে চলে আমাজনের বিরাট বনমালা। বনের বাঘ জাগুয়ার। বিশ্বখ্যাত, প্রচণ্ড শক্তিশালী, রাগী; বেড়ালজাতীয় এই প্রাণীটিকেই পুরো আমেরিকা মহাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘বেড়াল জাতের প্রাণী’ বলা হয়। হিংস্রতায় অনন্য হলেও বাঘগুলোর প্রজননের সংখ্যা কম; ফলে অন্য প্রাণীগুলোর জন্য ক্ষতি বয়ে আনতে পারে না। আমেরিকার প্রাচীন আদিবাসীদের সংস্কৃতি থেকে শুরু করে শিল্পকর্ম– সবকিছুতেই উজ্জ্বল চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। এখন ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারী প্রাণীটি আমাজনের সংরক্ষণ এবং টিকে থাকার আন্দোলনে অন্যতম অসাধারণ উদাহরণ হয়ে সারা দুনিয়াতে প্ল্যাকার্ডে, ভিডিও আর লেখায় ঘুরছে, আলোচনায় বারবার আসছে।

একসময় জাগুয়ারের বিচরণ পুরো আমেরিকা মহাদেশেই ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ম্যাক্সিকোর সীমানা, দক্ষিণের দেশগুলোর বিরাট এলাকা ওরা শাসন করত। এখন কমতে কমতে নিজেদের জীবন মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকায় নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। লেপার্ডের সঙ্গে খুব মিল থাকলেও জাগুয়ার আরও বেশি শক্তিশালী শারীরিক গড়নের; গায়ের চামড়া বাদামি বা কমলা, কালো দাগ আছে পুরো শরীরে। স্বাভাবিক বিচরণভূমি পেয়ে এখন তারা আমাজনের বিরাট বৃষ্টিময়, পাতা ঝরার বন, মহাদেশটির পাহাড়ি বনের ছোট ছোট গাছের এলাকা, গাছহীন বিস্তীর্ণ ঘাসের বনেও থাকে।

উত্তর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও তাদের দেখা গেছে। কোথায় থাকছে ওরা– নির্ভর করছে পানির উপস্থিতি এবং শিকারের প্রাণী পাওয়ার ওপর। গাছ বাইতে খুব দক্ষ এই প্রাণীটি গাছে চড়ায় খুব স্পৃহাপরায়ণ। তারা ভালো সাঁতারু। মাংসাশী প্রাণীটি নানা ধরনের শিকার করে। পানিতে নেমে মাছ খায়, কচ্ছপ, ভয়ানক দক্ষিণ আমেরিকান কুমির-জাতীয় কাইম্যানও শিকার করে অবলীলায়। প্যাকারি নামের নতুন পাওয়া বন্যশূকর, যেগুলোর এক-একটি লম্বায় ৩০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার, পূর্ণ বয়সের প্যাকারির ওজন ২০ থেকে ৪০ কেজি; তাদের ভালো শিকার ইঁদুর, কাঠবিড়ালি প্রজাতির সবচেয়ে বড় প্রাণী ক্যাপিবারাও। গরু এবং হরিণও ওরা শিকার করে। কোনো প্রাণীকেই সাধারণত একবারের বেশি আক্রমণ করতে হয় না জাগুয়ারকে। অসম্ভব শক্তিশালী মাথার খুলি ও দাঁত দিয়ে প্রাণীটিকে একবারেই আক্রমণ করে শিকার করে ফেলে এই বাঘ। জাগুয়ার একাই শিকার করে, থাকেও একাই। ১০ থেকে ৪০ স্কয়ার কিলোমিটার এক-একটি জাগুয়ারের এলাকা বা বিচরণভূমি প্রয়োজনে এক হাজার স্কয়ার কিলোমিটার এলাকা জুড়েও থাকে। এখন প্রায় বিপদের মুখে আছে ওরা, বলছে আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার)। কারণ, তাদের শিকার কত পাওয়া যাবে এবং বনের যে জীবনযাপনের সঙ্গে তারা অভ্যস্ত, সেগুলো আর কত দিন থাকবে, তার ওপরই জাগুয়ারদের টিকে থাকা নির্ভর করছে। তবে বিজ্ঞানী, প্রাণীবিদ এবং প্রাণী সংরক্ষণকর্মীরা বলছেন– আমাজনের ওপরই নির্ভর করছে জাগুয়ারের ভবিষ্যৎ। একমাত্র ওখািই তাদের জীবন প্রণালি এখনো তাদের মতো আছে। বিপদে আছে সেখানে ওরা অন্য প্রাণীদের মতোই। এই বনের পরিবেশ, প্রাণীদের জীবনযাপন এবং সংখ্যা নাগালের মধ্যে রাখতে জাগুয়ার অন্যতম প্রভাবক হলেও সেখানেও চোরা শিকারিরা তাদের শিকার করছে মাংস, চামড়া ও শরীরের অন্য অঙ্গের লোভে। খাবার হিসেবে খাওয়া এবং ওষুধ হিসেবে তৈরির জন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের অবৈধ শিকার পুরো দুনিয়াতেই পরিবেশ, মানুষ ও প্রাণীকুলের জন্য বিরাট সংকট। জাগুয়ারেরও তাই। তাদের শরীর থেকে ওষুধ তৈরির চাহিদা এশিয়াতেই তো বেশি। তাদের খাওয়ার ইচ্ছে, খাওয়ার সংকটে গবাদিপশু শিকারের হাত থেকে বাঁচাতে মেরে ফেলা, আবাসভূমির জলবায়ুর পরিবর্তন ও মানুষের বন কেটে উজাড়ের ফলে জাগুয়ার হারানোর মুখে। এখনও তারা হারাতে হারাতে যেমন বিরাট আকারের শরীর নিয়ে বিরাট এই বনমালায় আছে, তেমনি ছোট শরীরের জাগুয়ারও অভিযোজনে টিকে রহস্যময় বনটিতে আছে। মানুষ ও জাগুয়ারের লড়াই আমাজনে তাদের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে।

জানেন নিশ্চয়ই

তাদের পোশাকি নাম ‘জাগুয়ার প্যানথারা ওনকা’। কোথাও ওরা ‘প্যানথার’। এই বাঘ খুব পরিচিত। বাঘ ও সিংহের পরেই সবচেয়ে বড় বনে থাকা মাংসাশী প্রাণী ওরা।

লেপার্ডের সঙ্গে দেখতে সবচেয়ে মিল থাকলেও জাগুয়ারের মতো এত বড় বিড়ালজাতীয় আর কোনো প্রাণীই দক্ষিণ আমেরিকাতে বাস করে না। কুগ্যার বড় বন্য বিড়াল হলেও লেপার্ডের সমান। তবে কুগ্যারের শরীরে কোনো দাগ নেই। জাগুয়ারের মাথা থেকে পুরো শরীর প্রায় ২৪০ সেন্টিমিটার; কাঁধের উচ্চতা ৭৫ সেন্টিমিটার হয়।

আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত থেকে উত্তর, মধ্য আমেরিকাতে; মেক্সিকো থেকে উত্তর আর্জেন্টিনা পর্যন্ত তাদের বাস ছিল। ১৯৪০-এর দশকে শিকার শুরুর পর থেকে তারা কমছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাতে সম্প্রতি দেখা গেছে।

তাদের দেখার সবচেয়ে ভালো জায়গা ব্রাজিল। শুকনো মৌসুমে, এপ্রিল থেকে নভেম্বরের শেষের দিক পর্যন্ত এই বনে তাদের সবচেয়ে ভালো দেখা যায়।

কালো রঙের জাগুয়ারও আছে। তবে তারা বনের একেবারে গভীরে বেশি বাস করে, পানিতে বেশি শিকার করে।

এশিয়া ও আফ্রিকাতে তারা কালো লেপার্ড; আমেরিকাতে তারা কালো জাগুয়ার। জাগুয়ার এশিয়া ও আফ্রিকাতে এই প্রজাতি লেপার্ড নামে পরিচিত।

তাদের আবাসভূমি কেটে ফেলায় বা হারিয়ে যেতে থাকা প্রাণীগুলোকে নিয়ে প্রধান শঙ্কা। তাদের বাঁচাতে বিশ্বখ্যাত মার্কিন বিড়ালজাতীয় বিজ্ঞানী ও প্যানথারা.অর্গ নামের সংগঠনের সাবেক প্রধান ড. অ্যালান রবিনোউটজড ‘দি জাগুয়ার করিডোর ইনিশিয়েটিভ’ নামের বিশাল একটি প্রকল্প শুরু করেছেন ২০০৪ সালে। দক্ষিণ থেকে উত্তরে প্রাণীটির চলাফেরা ও জীবনযাপনের ক্ষেত্র তৈরি এবং সেগুলো অক্ষুন্ন রাখতে কাজ শুরু করেন তারা। তাতে জাগুয়ার লক্ষ্যহীনভাবে পুরো এলাকায় ঘুরে বেড়াতে পারবে এবং সন্তানের জন্ম দিতে পারবে– এই হলো তাদের উদ্দেশ্য।

প্রথম জাগুয়ার সংরক্ষণ শুরু হয়– ব্রাজিলের ‘দি ককসকোম্ব বেসিন ওয়াইল্ডলাইফ স্যানচুয়ারি’তে; সংক্ষেপে ‘সিবিডব্লএস’। তৈরি করা হয়েছে ১৯৮৪ সালে। অভয়ারণ্যটিতে এখন ২৪০ স্কয়ার কিলোমিটার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চল সংরক্ষিত হচ্ছে। এটি আছে তাদের দেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের, স্টান ক্রিক জেলায়।

এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাগুয়ার সংরক্ষণ কেন্দ্র। প্রায় ২০০টি মাংসাশী প্রাণী ভালোভাবে আছে।

সন্তান জন্মদানের সময় নারী জাগুয়ার পুরুষের সঙ্গে থাকে। বছরজুড়ে তারা শাবকের জন্ম দেয়। চারটি সন্তান হয়।

দুই বছর পর মা-বাবা সন্তানদের প্রকৃতির নিয়মে দূর করে দেয়।

তারা পানির কাছে থাকতে সবচেয়ে ভালোবাসে; পাতাঝরার বন, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বৃষ্টিময় বন অ্যামাজনে থাকতে চায়।

প্রায়ই গাছের ওপর থেকে নিচে তাকিয়ে পুরো এলাকা দেখে তারপর নজরে রেখে শিকারে নামে জাগুয়ার।

উত্তরা নিউজ/এস,এম,জেড