আপোষহীন আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতা মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করিম রহ.


» উত্তরা নিউজ ডেস্ক জি.এম.টি | | সর্বশেষ আপডেট: ০৯ মে ২০২০ - ০৫:৫১:০৯ অপরাহ্ন

মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করিম রহ কে চিনেন না এমন মানুষ হয়তে কমই রয়েছে।তিনি পীর সাহেব চরমোনাই নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন।তিনি ছিলেন আপোষীন অালেমে দীন,বাগ্মী ও রাজনীতিবিদ।প্রবল স্মৃতিশক্তি, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব,অপূর্ব বাগ্মীতা ও সততার ফলে তিনি হয়ে উঠেন বিখ্যাত। ইসলাম,দেশ, মানবতা ও স্বাধীনতার অতন্দ্রপ্রহরীর ভুমিকায় জীবন কাটিয়েছেন তিনি।সমসাময়িক অন্যান্য অালেমদের তুলনায় তিনি ছিলেন উদারচেতা ও ত্যাগী।টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া আর রূপসা থেকে পাথুরিয়া দীনের পয়গাম নিয়ে ছুটেছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে।নির্মোহ,অাপোষহীন মানসিকতার জন্য তিনি আজও স্মরণীয় বরণীয় হয়ে আছেন।

নীতির প্রশ্নে তিনি চুল পরিমাণ ছাড় দিতেও নারাজ ছিলেন।সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আমরণ সংগ্রামী।তাঁর সংগ্রাম মূখর ৭১ বছর হায়াত কাটিয়েছেন ইসলাম,দেশ,মানবতার কল্যাণে।রাজনীতি থেকে যখন অালেম সমাজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তিনি তখন রাজনীতিকে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করেন।তাঁর জীবনে দুটি দিক আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।সমাজ সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলাম প্রতিষ্টার সংগ্রাম।সমাজ ও রাষ্ট্রকে ইসলামীকরণে তিনি যে প্রয়াস চালিয়েছেন তা যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

রাজনৈতিক দর্শনঃমাওলানা সৈয়দ ফজলুল করিম পীর সাহেব চরমোনাই রাজনীতির পাঠ গ্রহণ করেন তাঁরই উস্তাদ, যুগশ্রেষ্ট বুজুর্গ আল্লামা মুহাম্মুদুল্লাহ হাফিজ্জি হজুরের কাছ থেকে।ফাফিজ্জি রহ যখন তওবার ডাক দিয়ে রাজনীতির মাঠে নামেন তখন থেকে পীর সাহেব চরমোনাই রহ রাজনীতিতে সক্রিয় হয়।প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় তিনি হাফিজ্জি হুজুর রহ এর সাথে নির্বাচনি প্রচার প্রচারণাসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করেছেন।ফলে তাঁর অর্জিত হয় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। ১৯৮৭ সালে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন( বর্তমান,ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)নামের রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি রাজনীতির ময়দানে পুরোদমে বিচরণ শুরু করেন।রাজনীতির এই পিচ্ছিল ও কন্টকাকীর্ণ ময়দানে তিনি সিপাহসালারের ভুমিকায় অবতীর্ণ হন।তিনি রাজনৈতিক ময়দানে আগমনের ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা।রাজনীতিকে গ্রহণ করেন ইবাদত হিসেবে।জোট মহাজোটের বাইরে রাজনীতিতে ক্রমান্বয়ে অালোচিত হয়ে উঠেন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন।সগোত্রীয় কর্তৃক শিকার হন বিভিন্ন অাঘাতের।

বস্তুবাদী রাজনৈতিক দল গুলো শুরু করে শত্রুতামি ।ঘরের মানুষও পর হয়ে যায়। ইসলামী দল সমূহ নিয়ে গঠন করেন ইসলামী ঐক্যজোট।পরে জোটের শর্ত ভেঙে অন্যান্য দল বিএনপির জোটে যোগ দিলেও তিনি সেই জোটে যোগ দেয়নি।ফলে তিনি সবার শত্রুতে পরিণত হন।বিএনপির জোটে যারা যোগ দিয়েছেন তারা পীর সাহেব চরমোনাই রহ কে নানা অপবাদ দিতে শুরু করেন।এসব কওমী ঘরানার জোটের অপবাদ কে গ্রহণ করে জামায়াতও।বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সবাই পীর সাহেব চরমোনাই রহ কে আওয়ামী লীগের দালাল বলে তিরস্কার করতে থাকে। পীর সাহেব চরমোনাই রহ এর অপরাধ ছিল তিনি নীতি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে বিএনপির জোটে যোগ দেয়নি।

তিনি মনে করতেন, আওয়ামী লীগ বিএনপি একই মুদ্রার এপিট ওপিট।দু’দলেরই প্রধান হলো নারী।নারী নেতৃত্ব ইসলামে হারাম।সেই কারণে তিনি ক্ষমতার মোহে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জোটে যোগ দেয়নি।অবশ্যই, ১৯৯৬সালে জামায়াত আওয়ামী লীগের জোটে থাকাকালীন পীর সাহরক চরমোনাই রহ কে বিএনপির দালাল বলেও অপবাদ দিয়েছিল।যাদের জীবনটাই দালালির মধ্য দিয়ে তাদের কর্তৃক পীর সাহেব চরমোনাই রহ কে এমন অপবাদ প্রদান হাস্যকর।তারা এখনও বলে বর্তমান পীর সাহেব চরমোনাই ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দালাল।যদিও এখন এসব মার্কেটে খায়না।

রাজনৈতিক ময়দানে তিনি জামায়াত কে কঠিন চ্যালেঞ্চ ছুড়ে দিয়েছিলেন।তিনি বলেন,জামায়াত কোন ইসলামী দল নয়।তারা যদি জামায়াত কে ইসলামী দল হিসেবে প্রমাণ করতে পারে তাহলে আমি দল বিলুপ্ত করে জামায়াতে যোগ দিব।তারা আদৌ সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারেনি এবং পারবেও না। রাজনীতিকে তিনি ইবাদত হিসেবে গ্রহ্রন করেছিলেন।নিছক ক্ষমতার মোহে তিনি রাজনীতি করেননি।তিনি আদর্শিক রাজনীতি চর্চার প্রবাদ পুরুষ।তাঁর কথায় ছিল অসাধারণ যুক্তি।যখন রাজনীতির ময়দানে ভাষণ দিতেন তখন মনে হত তিনি রাজনীতিকদের গুরু।যখন বয়ানের ময়দানে বয়ান করতেন তখন মনে হত তিনি রাজনীতিদই না। তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মত অসাধারণ উপস্থিত জ্ঞান ছিল তাঁর মধ্যে।রাজনীতির ময়দানে তিনি ছিলেন ঝানু রাজনীতিবিদ। বিএনপির জোটে যোগ না দেওয়াটা সঠিক ছিল তা প্রমাণিত হয় ২০১৬ সালে এসে যখন ১৭ বছর পরে ইসলামী ঐক্যজোট নাম সর্বস্ব ব্যানার নিয়ে শূন্য হস্তে বিএনপির জোট ত্যাগ করে।তাঁর অাপোষীনতার কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আজ রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।স্থান করে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। ধীরে ধীরে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন রাজনৈতিক অঙ্গনে।এক সময় যে দলের মাধ্যমে বা নেতৃত্বে দেশ পরিচালিত হয়েছে সেই জাতীয় পার্টিকে পেছনে ফেলে দুর্বার বেগে এগিয়ে যাচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। #

আধ্যাত্মিকতাঃ তিনি ছিলেন একজন অাধ্যাত্মিক সাধক।মানুষকে ইসলামের সঠিক দর্শন পৌছে দিতে তিনি নিরলস সাধনা করে গেছেন।একবার,এক সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিল, হুজুর আপনি পীর হয়ে কেন রাজনীতি করেন?তিনি বলেছিলেন,যিনি রাজনীতি করে না তিনি পীর হয় কিভাবে?দেশে যখন পীরের নামে ভন্ডামী চলে,চলে মাজার পূজার নামে শিরক বিদাত তখন তিনি এসবের বিরুদ্ধে একাই লড়েছেন।তিনি চতুরমুখী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন নতুনত্ব এনেছেন ঠিক তেমনি অাধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে পাপাচারে নিমজ্জিত জনগোষ্ঠী কে ইসলামের সঠিক দর্শন পৌছে দিয়েছেন।কত চোর, ডাকাত,বদমাইশ তাঁর বয়ান শুনে ভালো হয়েছে তাঁর পরিসখ্যান কারো কাছে জানা নেই।

তিনি ছিলেন পরশমণি। যার সংস্পর্শে যিনাকার বনে যেত আল্লাহর ওলী।যার বয়ান এতটাই হৃদয়গ্রাহী ছিল যে,চোর ডাকাতদের বদমাইশদের চোখেও অশ্রুর বন্যা বয়ে যেত।পাথরের ন্যায় অন্তরও মোমের মত গলে যেত।তিনি হকের পক্ষে থেকে পীর মুরিদী ও তরিকা নিয়ে কাজ করার কারণে ভন্ড পীর থেকে মানুষ বাঁচতে পেরেছে।আমার মনে হয়,চরমোনাই পীর সাহেব না হলে ইসলামে যে হক্কানী পীর আছে তা মানুষ জানতে পারতনা।সাধরণ মানুষ মনে করে পীর মানেই হল ভন্ড।

পীর সাহেব চরমোনাই রহ এর কারণে জন সাধারণ বুঝতে সক্ষম হয়েছে সব পীর ভন্ড হয়না।কিছু কিছু পীর সাহেবের মাধ্যমে মানুষ ইসলামের সঠিক দর্শন বু্ঝতে পারে ও জানতে পারে।পীর সাহেব চরমোনাই রহ এর কারণে যেমন ভন্ড পীরদের মানুষ খারাপ ভাবতে শুরু করেছে ঠিক তেমনি যারা ইসলামের দোহাই দিয়ে ক্ষমতার মোহে রাজনীতি করে তাদেরও চিনতে পেরেছে।পীর সাহেব চরমোনাই রহ এর অাপোষহীন মানসিকতার জন্যে রাজনীতিতে যেমন গুণগত ও আদর্শিক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে ঠিক তেমনি ক্ষমতালোভী ও দালালদের আসল চেহারা জাতির কাছে উন্মোচিত হয়েছে এবং হচ্ছে।

লেখকঃনুর আহমদ সিদ্দিকী