আদালতের নিষেধাজ্ঞায় আটকে যাচ্ছে গ্যাস বিল


» আশরাফুল ইসলাম | ডেস্ক এডিটর | | সর্বশেষ আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০১৯ - ০৪:০৬:১০ অপরাহ্ন

আদালতের নিষেধাজ্ঞায় তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বিল আদায় আটকে যাচ্ছে। শিল্প মালিকরা নিজেদের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা বলে বিল প্রদানের বিপরীতে আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছে। আর আদালত প্রকৃত বিলের বদলে পরিশোধের জন্য একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক বেঁধে দিচ্ছে। তাতেই শিল্প মালিকদের কাছে প্রতি মাসে আটকে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গ্যাস বিল। বর্তমানে শিল্প মালিকদের কাছে বকেয়া গ্যাস বিলের অঙ্ক বাড়তে বাড়তে ৩৬৩ কোটিতে ঠেকেছে। আর এ খাতে তিন মাসের গড়ে ৪৬ মাসের সমতুল্য বিল বকেয়া পড়েছে। তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুর তিন জেলায় আদালতের মাধ্যমে গ্যাস বিল আটকে দেয়া শিল্প-প্রতিষ্ঠান বেশি রয়েছে। তবে এখনো ময়মনসিংহ জেলায় এমন কোন শিল্প পাওয়া যায়নি। তিতাসের বকেয়ার অন্য সব আদায় হলেও এই বিল আদায় নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তিতাস তার বিল আদায়ের মাসিক বিবরণীতে ওই শিল্প কারখানাকে বলা হচ্ছে নিষেধাজ্ঞাধীন শিল্প। ওসব শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে আদালতের নিষেধাজ্ঞায় দুই কোটি টাকা পর্যন্ত বিল আদায়ে বাধা দিচ্ছে। গ্যাস বিলের ৩৬৩ কোটি টাকা বকেয়ার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের উদ্যোক্তাদের কাছে সব থেকে বেশি বকেয়া পড়েছে। ওই জেলার শিল্প মালিকদের কাছে তিতাসের ২৪৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। জেলাটিতে শিল্প খাতের বিলের ৫৪ দশমিক ৬৭ মাসের সমপরিমাণ বিল অনাদায়ী রয়েছে। তারপরই রয়েছে গাজীপুরের উদ্যোক্তাদের কাছে। সেখানে বকেয়ার পরিমাণ ১০৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ওই জেলায় এ ধরনের শিল্প মালিকদের কাছে ৩৯ দশমিক ২৬ মাসের বিল বকেয়া রয়েছে। বাকি অর্থ জমে আছে ঢাকাতে। তবে ঢাকায় জমে থাকা টাকার পরিমাণ ১২ কোটি ৪৩ লাখ। সব মিলিয়ে ১৮ মাসের সমতুল্য বকেয়া রয়েছে।

সূত্র জানায়, শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা কয়েক মাসের বিল ইচ্ছাকৃত বকেয়া পড়ার পর তিতাস কঠোর হতে গেলেই তারা আদালতের দ্বারস্থ হন। সেক্ষেত্রে উদ্যোক্তা আদালতের কাছে আর্জিতে বলছেন, তার প্রতিষ্ঠানে বহু শ্রমিক কাজ করেন। এখন গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে তার কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। এতে শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়বে। আদালত দেখা যাচ্ছে তখন ওই প্রতিষ্ঠানের বিল প্রদানের সীমা বেঁধে দিচ্ছে। ফলে প্রতি মাসেই শিল্প মালিকদের কাছে বিপুল অংকের গ্যাস বিল বকেয়া থাকছে। আর বকেয়া বিলের বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন হওয়াতে কেউ তা কথা বলতেও চান না। তবে বিল আদায় করার উদ্যোগ হিসেবে তিতাসের পক্ষ থেকে রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে আপীল করা হচ্ছে। তাতে আপীল বিভাগ কিছু অর্থ বাড়িয়ে বিল করার অনুমতি দিচ্ছে। তিতাস তখন আবার আপীল করছে। বর্তমানে তিতাসের এ ধরনের ১ হাজার ৪০০টির মতো মামলা রয়েছে। এর ফলে একদিকে বিল তো আদায়ই হচ্ছে না. অন্যদিকে মামলা পরিচালনার জন্য তিতাসের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন প্রণয়নের পর সেখানে একটি ট্রাইব্যুনাল করা হয়েছে। উচ্চ আদালত থেকে অনেক মামলা বিইআরসিতে প্রেরণের নির্দেশ দেয়া হয়। আবার কোন কোন মামলা উচ্চ আদালত আমলে নিতেও পারে।

সূত্র আরো জানায়, পেট্রোবাংলার কাছে তিতাস আগে গ্যাসের বিল বকেয়া রাখতে পারতো। কিন্তু তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি আমদানির পর থেকে আর বিল বকেয়া রাখা যায় না। বরং তিতাস নগদ অর্থে গ্যাস ক্রয় করে বাকিতে বিক্রি করছে। তাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। তবে বিদ্যুত এবং জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিদ্যুত এবং গ্যাসের সমস্যা সমাধানে বৈঠক করেছে। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা, বিদ্যুত, জ্বালানি এবং খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও বিদ্যুত এবং জ্বালানি বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ব্যবসায়ীদের কাছে বিল আদায়ে সহায়তা চায় সরকার। ব্যবসায়ীরা সরকারকে বিল আদায়ে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীরা বলছেন তারা বিল আদায়ে সরকারকে সহযোগিতা করবেন।

এদিকে তিতাস বলছে, নিষেধাজ্ঞাধীন শিল্পের বিপরীতে সাধারণ শিল্প যারা বিল আদায়ে কোন বাধার সৃষ্টি করে না, তাদের বিল আদায়ের শতকারা হার ১০০ ভাগ। অর্থাৎ যারা গ্যাস ব্যবহার করছেন তারা সবাই বিল দিচ্ছে। গত জুলাই মাসে দেখা যায় তিতাসে নিষেধাজ্ঞাবিহীন শিল্প মালিকরা ২৩০ কোটি ৬০ লাখ টাকার গ্যাস ব্যবহার করেছেন। এর বিপরীতে তারা বিল দিয়েছে ২৩০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অর্থাৎ ব্যবহারের চেয়ে ৩০ লাখ টাকা বেশি বিল আদায় করেছে।

অন্যদিকে তিতাসের বিল আদায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিল আদায় সংক্রান্ত বিষয়ে যারাই উচ্চ আদালতে যায়, তাদের বিষয়টি দেখার জন্য তিতাসের প্রধান কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়। এসব বিষয় তিতাসের প্রধান কার্যালয় থেকে দেখা হয়। আর যেহেতু বিষয়গুলো বিচারাধীন। তাই আদালতের নির্দেশ মতো কাজ কররা হয়। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।