আত্রাইয়ে  শীত শুরুর সাথে সাথে কুমড়ো  বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯ - ০৫:১৬:৫৫ অপরাহ্ন

আত্রাই (নওগাঁ) সংবাদদাতা :  নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কুমড়ো বড়ি তৈরির ধুম পড়েছে। আর এই বড়ি তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। এই কুমড়ো বড়ি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চালান হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। শীতকালই হচ্ছে এই কুমড়ো বড়ি তৈরির মৌসুম। আত্রাই উপজেলার সব চেয়ে বেশি বেওলা, কুমঘাট, সৈয়দপুর(সদুপুর), মির্জাপুর, বান্দাই খাড়া, সাহেব গঞ্জ, পাঁচুপুর গ্রামে এই সুস্বাদু কুমড়ো বড়ি তৈরি করা হয়ে থাকে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা য়ায, অনেক সকাল থেকেই বাড়ির উঠানে সহ বিভিন্ন জায়গায় চলে কুমড়ো বড়ি তৈরির কাজ। বাড়ির গৃহিণী থেকে শুরু করে পুরুষ এবং ছোট-বড় ও বয়স্ক লোক সবাই মিলে তৈরি করেন কুমড়ো বড়ি। উপজেলার এ সকল গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে ফাঁকা রোদ মাখানো বিভিন্ন স্থানে চাটাইয়ের উপড় সারি সারি করে বিছানো সাদা রঙ্গের মাসকালাইয়ের সাথে চাল কুমড়া দিয়ে তৈরি কুমড়ো বড়ি শুকানো ধুম। কেউ কেউ আবার শুকনো বড়িগুলো বাঁশের চাটাই থেকে খুলছে এ রকম অনেক দৃশ্য চোখে পড়বে। ভোর রাত থেকে শুরু হয় এই কুমড়ো বড়ি তৈরির কাজ। এ হলো মাসকালাই ও চাল কুমড়া দিয়ে তৈরি কুমড়ো বড়ি তৈরির বর্ণনা।
আত্রাই উপজেলার সব চেয়ে বেশি কুমড়ো বড়ি তৈরি করা হয়ে থাকে বেওলা, কুমঘাট, সৈয়দপুর (সদুপুর), গ্রামে। শত বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ এই কুমড়ো বড়ি বাণিজ্যিক ভাবে তৈরি করে আসছে কারিগররা। বেউলা, কুমঘাট,সৈয়দ পুর (সদুপুর) মির্জাপুর, সাহেব গঞ্জ, পাঁচুপুর,বান্দাই খাড়া গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবারের মানুষ পৈত্রিক এই পেশাটিকে ধরে রেখেছে। এই পরিবার গুলো কুমড়ো বড়ি তৈরির কারিগররাই আজো ধরে রেখেছে ঐতিহ্যপূর্ণ এই কুমড়ো বড়ির শিল্পটি। সারা বছর টুকটাক বড়ি তৈরি হলেও শীত মৌসুমে এই কুমড়ো বড়ি তৈরির ধুম পড়ে যায় এই সব গ্রামগুলোতে। বর্তমানে ওই গ্রামের সকল কারিগররা এই সুস্বাদু কুমড়ো বড়ি তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। শীত মৌসুমে এই বড়ির চাহিদা বেশি থাকায় এখন ওই গ্রামে বড়ি তৈরি নিয়ে চলছে কারিগরদের প্রতিযোগিতা। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কুমড়ো বড়ি তৈরি হয়ে থাকে তবে খুব সীমিত। শীতের এ মৌসুমে মূলত এই বড়ি তৈরি করা হয়ে থাকে। দিন দিন এর চাহিদা বেড়েই চলেছে কিন্তু বড়ি তৈরির উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভ অনেকটাই কমে গেছে বলে তারা জানান।
কুমড়ো বড়ি তৈরির কারিগররা জানিয়েছেন, বড়ি তৈরির সব উপকরণই পুষ্টি গুণ সম্পন্ন খাবার পণ্য। বড়িতে রয়েছে অধিক মানের পুষ্টি। বড়ি তৈরিতে প্রথমে মাসকালাই পানিতে ভিজিয়ে ঘষে পরিস্কার করে পাটায় পিষে অথবা মেশিনে ভেঙ্গে গুড়া করে আবার তা পানি দিয়ে ভিজিয়ে রুটি তৈরির আটার মতো অবস্থায় পরিণত করা হয়। এরপর এর সঙ্গে চাল কুমড়া পিষিয়ে সাথে কালি জিরা সহ অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে বড়ি তৈরি করা হয়। এরপর তা ৩-৪ দিন রোদে ভালো ভাবে শুকানোর পর বিক্রয় করা হয়। বড়িকে শক্তিশালী করার জন্য এর সঙ্গে খুব কম পরিমাণে আলো চালের আটা মিশানো হয় বলে তারা জানান। প্রতি কেজি মাসকালাই থেকে প্রায় ৫ শ থেকে ৬ শ গ্রাম কুমড়ো বড়ি তৈরি হয়। এই বড়ি মূলত মাসকালাই, চাল কুমড়া, জিরা, কালোজিরা, মোহরী দিয়ে তৈরি করা হয়। যে কোন রান্না করা তরকারির সঙ্গে এই কুমড়ো বড়ি রান্না করা যায়। আর রান্নার পর তরকারিতে এই বড়ি যোগ করে অন্য রকমের এক স্বাদ হয়।
বেওলা গ্রামের পরিতোষ চন্দ্র জানান,বাপ দাদার আমল থেকে এই কুমড়ো বড়ি করে আসছি এখন আমার সন্তানেরা এ বড়ি তৈরি করছে।বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আসল কুমড়ো বড়ি তৈরি করা কষ্ট সাধ্য।
মির্জাপুর গ্রামের বড়ি তৈরির কারিগর উজ্জল সহ আরো অনেকেই জানান, কুমড়ো বড়ি তৈরি আমাদের বাপ-দাদার পেশা। তাই আজো এই পেশা করে আসছি। এই বড়ি মূলত মাসকালাই, চাল কুমড়া, জিরা, কালোজিরা, মোহরী দিয়ে তৈরি করা হয়। প্রতি কেজি বড়ি ২০০-২২০ টাকা (বড় আকারের) এবং ১২০-১৫০ টাকা (ছোট আকারের) করে খুচরা ও পাইকারি বিক্রয় করা হয়। আত্রাইয়ের এ গ্রামগুলোর তৈরি কুমড়ো বড়ি নিজ এলাকার প্রয়োজন মিটিয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট, রংপুর ও দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে  সরবরাহ করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিনিয়তই পাইকাররা এসে তাদের কাছ থেকে এই বড়ি কিনে নিয়ে যায়। এছাড়া তারা স্থানীয় বিভিন্ন হাটেও খুচরা বিক্রি করি। তবে বড়ি তৈরির উপকরণের দাম বেশি হওয়াই এবার তাদের লাভটা খুব কম হচ্ছে বলে তারা জানান।
একই গ্রামের বড়ি তৈরির কারিগর মিঠন কুমার সরকার  আরো জানান আমরা বিভিন্ন এনজিও-সংস্থা থেকে ঋন নিয়ে কোন মতে এই শিল্পটাকে ধরে রেখেছি। যার কারণে আমাদের ইচ্ছে থাকলেও এই শিল্পটাকে প্রসারিত করতে পারছি না কারণ আমাদের পুজি কম। আমরা সরকারি সহযোগীতা বা কম সুদে যদি ঋণ পেতাম তাহলে বড় ধরনের অর্থ খাটিয়ে এই শিল্পটাকে আরো অনেক বড় করতে পারতাম। আগের তুলনায় এখন বড়ি তৈরির উপকরণের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় লাভ অনেকটাই কমে গেছে। তবু শত কষ্টেও বাপ-দাদার এই পেশাটি আমরা ধরে রেখেছি।