আগের দিনের বিনেদনের স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য বায়স্কোপ


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ - ০৮:৫২:৪৯ অপরাহ্ন

গ্রাম-বাংলার হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্যের নাম বায়স্কোপ। হাত দিয়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে দর্শনীয় স্থান, কিংবা বিভিন্ন চিত্র কর্মের ছবি দেখানো হতো এই বায়স্কোপে। গ্রাম বাংলার জনপ্রিয়সব কাহিনী ও কাল্পনিক চিত্রও দেখানো হতো এই মাধ্যমে। মুড়ির টিনের মতো একটি বাক্সের কাচের জানালায় চোখ রাখলেই ছবি আর কন্ঠের বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠতো এক অজানা পৃথিবী।
চোখ ধাঁধাঁনো আধুনিকতার এমন সময়েও গ্রামীণ জনপদে বায়স্কোপ দেখতে মানুষের ভীড় চোখে পড়ে। এই প্রজন্মতো বটেই, এখনো বায়স্কোপ দেখতে বসে যান প্রবীনরাও।
চার কোনা একটি টিনের বাক্সে গোলাকৃতি ৪ থেকে ৬টি কাচের জানালা। তার মধ্যে দেশ বিদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, রাজা বাদশা, জনপ্রিয় নায়ক নায়িকা, বিভিন্ন ধর্মীয় পবিত্র স্থাপনা, মৃত্যুর পরের নানা কাল্পনিক কাহিনীর ৩৫ থেকে ৪০টি ছবি জোড়া দিয়ে লাগানো হয়। বাক্সের মধ্যে দুই পাশে দুটি ঘুড়ির লাটাইয়ে তা পেচিয়ে প্রদর্শন করা হয়। বাইরে থেকে স্বচ্ছ কাচের ওপর চোখ রাখলে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যতে হয় দর্শকদের।
বিনোদনের এই মাধ্যমটি আমাদের দেশে বায়স্কোপ নামে অধিক পরিচিতি পেলেও ইংরেজিতে একে পিপ শো বলে অভিহিত করা হয়। যার অর্থ উঁকি দিয়ে দেখা। জানাযায়, পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরোপের একটি দেশের রাস্তা দিয়ে এক নগ্ন নারীর হেটে যাওয়র দৃশ্য বদ্ধ ঘরের ছিদ্র দিয়ে দেখেন এক লোক। ছিদ্র দিয়ে দেখার সেই ধারণা থেকেই পরবর্তিতে তৈরী হয় পিপ-শো বা বায়স্কোপের বাক্স। ইউরোপে ১৫ থেকে ১৭ শতাব্দীতে বায়স্কোপ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৮৯৪ সালের পর এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় বিশ্বব্যাপি এর প্রদর্শনী শুরু হয়।
অনেকে বায়স্কোপকে চলচ্চিত্র আবিস্কারের পূর্ব রুপ বলে ধারণা করেন। উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের জনক মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে তার এলাকায় বায়স্কোপ প্রদর্শন করেন।
স্বাধীনতার আগে ভারত থেকে আঁতশী কাচ এনে টিন আর কাঠ দিয়ে এসব বায়স্কোপ তৈরী করে গ্রামে-গঞ্জের আর মেলায় প্রদর্শন করতো একদল মানুষ। অনেকে এই বায়স্কোপ প্রদর্শনের আয় দিয়ে সংসার চালাতেন।
বর্তমানে প্রায় হারাতে বসেছে আগের যুগের বিনোদনের প্রধান বাহক বায়স্কোপ। হয়তো আর কিছু সময়ের মধ্যে হারিয়ে যাবে বাংলার ঐতিহ্য বায়স্কোপ। গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রসঙ্গে আত্রাই উপজেলার   প্রবীণ মাস্টার মশায় নামে খ্যাত  মোঃ ওমর আলী মাস্টার বলেন,আমি ছোট বেলায়, অনেক বায়স্কোপ দেখেছি, বর্তমানে এর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে আগের দিনের বিনোদনের এক মাত্র জিনিস ই ছিল বায়স্কোপ। ছোট বেলায় বায়স্কোপ দেখার জন্য এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে ছুটে গিয়েছি,এখন তা শুধু ই রুপকথার মতো মনে হয়।তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ভবিষ্যত প্রজন্ম  জানবে ই না বায়স্কোপ নামে বিনোদনের যন্ত্র ছিল?এক সময় নতুন প্রজন্মকে বই পুস্তক থেকে বায়স্কোপ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।