অমানবিকতা! গুজবের আড়ালে অন্য কোন ফন্দি ফিকিররের সংকেত নয় তো!!


» মোঃ সবুর মিয়া উত্তরা নিউজ | | সর্বশেষ আপডেট: ২৯ জুলাই ২০১৯ - ১১:২৯:২৩ পূর্বাহ্ন

অদ্ভুত এক উটের পিঠে চলেছে দেশ! (The country is going on a strange camel!) চলছে সব গল্প কাহিনীর মত। আমাদের দেশে একটার পর একটা অমূলক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, ছোটকালে আমরা আমাদের অভিভাবক ও পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে শুনেছি কোন ব্রিজ, কালভার্ট করতে গেলে শিশুদের মাথা লাগে, এমনও হয়েছে ছেলে ধরার ভয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়েছে।
একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানমুখী, আইটি নির্ভর বিশ্বের উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে শিক্ষিত জাতি কে এখনো শুনতে হচ্ছে সেই অলৌকিক কাল্পনিক গল্প। (The miraculous story of a nation still educated, standing at the doorstep of developing a science-oriented, IT-based world in the 21st century.) ছেলে ধরা বা শিশুদের মাথা কেটে ব্রিজের পিলারের নিচে দিয়ে ব্রিজকে শক্তিশালী করা হয়! আমার বিশ্বাস বর্তমান সময়ে কোন আধুনিকমনা মানুষ এই তথ্যটি বিশ্বাস করেন না।

বাস্তবে বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে মস্তকবিহীন শিশুর লাশ, কিবা শিশুর মস্তক। তাহলে কেন এমন অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, চরম বর্বরতা, আদিম যুগের সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। নেত্রকোনাতে এক যুবকের ব্যাগের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল একটা শিশুর মাথা এলাকাবাসী যুবকটিকে সেখানে গণধোলাই দিয়ে মেরে ফেলে মূলত তারপর থেকেই ছেলে ধরা সন্দেহে এবং সন্দেহবশত গণধোলাই এর মত বর্বর ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে গণধোলাইয়ের শিকার হয়ে প্রায় ৮ থেকে ১০ জনের ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতলে আহত হয়ে ভর্তি আছে অনেকে।

গণধোলাইয়ের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করিদের মধ্যে মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি ফোকাস হচ্ছে ঢাকার উত্তর বাড্ডার তসলিমা বেগম রেনু। রেনু বেগম উত্তর বাড্ডার একটা স্কুলে গিয়েছিল তার চার বছরের ছোট্ট মেয়ে তুবাকে স্কুলে ভর্তি সংক্রান্ত বিষয় কথা বলার জন্য কিন্তু কি বর্বরতা, কেমন নিষ্ঠুরতা সাধারণ আমজনতা তেমন কিছু বিচার-বিশ্লেষণ না করেই শুধু সন্দেহবশত ছেলে ধরা সন্দেহে তাকে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় করে দিল আর কিছু মানুষ মোবাইল দিয়ে ছবি তুলে ও ভিডিও ধারন করে ছড়িয়ে দিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কারো মধ্যে একটু উপলব্ধি হলো না একটু যাচাই করে দেখা যাক,সে কি সত্যি কারের ছেলে ধরা নাকি অন্য কিছু। আমরা কি একটু নিজেকে প্রশ্ন করতে পারি না? জাতি হিসেবে আমাদের মানবিকতার অবস্থান কোথায়?

রেনুর চার বছরের ছোট্ট মেয়েটি দিকে তাকালে কার না চোখে পানি আসে? মেয়েটি এখন বুঝতে পারছে না তার মা আর কখনো ফিরবে না।

গণধোলাইয়ের আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল, ঘটনাটি ছিল অনেকটা চলচিত্রের গল্পের মত, গাজীপুরে স্বামী এবং স্ত্রী রিকশায় করে যাচ্ছিল সংগে ছিল স্বামীর এক বন্ধু, পথিমধ্যে স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে তর্ক বিতর্ক হচ্ছিল স্ত্রী হঠাৎ স্বামী কে উদ্দেশ্য করে বলছিল ছেলে ধরা, ছেলে ধরা, ঠিক স্বামীও তখন স্ত্রী কে উদ্দেশ্য করে বলছিল ছেলে ধরা, ছেলে ধরা, তখন উপস্থিত জনতা স্বামী এবং স্ত্রী দুইজনকেই চরম ধোলাই দিয়েছিল, ধোলাই থেকে বাদ পড়েছিল না স্বামীর বন্ধুটিও।
স্ত্রী তখন চিৎকার করে বলছিল ভাইয়েরা থামেন আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কিন্তু কে শুনে কার কথা, আমজনতা হয়েছিল বধির ও অন্ধের মত।

গুজবের অন্ধকারে নিমজ্জিত বাংলাদেশ ।সব কিছুতেই গুজব, গুজব আর গুজব। গুজব টাও কি গুজব, এটাই হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের শব্দ, মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রুগি হাসপাতালে ঠাঁই হচ্ছে না। মানুষ মারা যাচ্ছে এমনকি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ডাক্তার পর্যন্ত মারা যাচ্ছে। কল্লাকাটা, ছেলেধরা গুজব পাওয়া যাচ্ছে,শরীলের নিচের অংশ (ধড়) অনেক অভিযানের পরে পাওয়া যাচ্ছে মস্তক, মাথা কাটার সঠিক কারণ জানা যায় না। কারণ অপরাধীকে মরতে হচ্ছে আম জনতার হাতে অথবা ক্রসফায়ারে।

পদ্মা সেতু ইস্যু নিয়ে দুইটি ঘটনা:
প্রথমটি হলো- যখন পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয়, তখন চীনা রীতি অনুসারে কোন সেতু করতে গেলে পশুর রক্ত পানিতে প্রবাহিত করে তারা উদ্বোধন করে থাকে, ঠিক তেমনি ভাবে বাংলাদেশ যখন চীনা প্রতিষ্ঠান পদ্মা সেতুর কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিল, তখন গরু বলি দিয়ে গরুর রক্ত নদীতে প্রবাহিত করেছিল যে ঘটনাটি বিভিন্ন মিডিয়াতে এসেছিল এবং একাত্তর টেলিভিশন ২৬শে জুলাই-২০১৯ শুক্রবার আলোচিত হয়েছে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হল:- চাইনিজ কোম্পানি বলেছিল পদ্মা সেতু করার জন্য মাথা দরকার অর্থাৎ মাথা মানে বুঝিয়ে ছিল মানুষ দরকার, দক্ষ মানুষ,মাথা ওয়ালা কর্মঠ দক্ষ মানুষ দরকার।পদ্মা সেতুর পিলারের গোড়া শক্ত করার জন্য মানুষের কাটা মাথা দরকার নই। হুজুগে বাঙালি বুঝলো নিজের মত, ঘটাল অন্য কিছু, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন বিষয়ে গুজব আমাদের সমাজে দেখেছি কিন্তু বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে এক প্রান্তে একটি ঘটনা ঘটলে সেকেন্ডের মধ্যেই পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া যথেষ্ট সহজ। সেই সহজ কাজটি করে একশ্রেণীর কর্মজীবী বেকার মেধাবী, যাদের বস্তা পচা মেধা, জঘন্য, নোংরা, হিংসাত্মক গুজব ছড়ানোর জন্য খুবই উপযোগী।(By doing that simple task, the unemployed working class men, whose sacks are very useful for spreading rotten, insidious, filthy, violent rumors.)

যুগ যুগ ধরে চলে আসা গুজবের এই বাংলাদেশ, গুজব থেকে রক্ষা পাওয়ার মত সভ্য শিক্ষিত জাতি হিসেবে নিজেদেরকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। আমার তো মনে হয় আমরা এখনও আধুনিক বিশ্বে মানসিক ও বাস্তবিক বিকাশে অনেক পিছিয়ে। দেশের বহু অশিক্ষিত,অল্পশিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত মানুষ এখনো কুসংস্কার এর মধ্যে বসবাস করে। কুসংস্কার ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যা কে ধর্মীয় রীতিনীতি হিসেবে পালন করে। তাবিজ,কবজ হাতে, পায়ে, কোমরে দিয়ে রোগ মুক্তির উত্তম পন্থা বলে মনে করে। সেই জাতি গুজবে কান দিবে, গুজব ছড়াবে, গুজব কে উৎসাহিত করবে, এটা অনেকটা স্বাভাবিকই মনে হয়।

অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন গুজবকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে এটা হতে পারে কারণ রাজনীতি তো মানব জীবনের থেকে বিচ্যুত কোন অংশ নয়। গুজব থেকে বের হতে হলে সমাজকে আরো বেশি সজাগ হতে হবে। আধুনিকমনা হতে হবে, মানবতার কল্যাণমুখী হতে হবে।

গুজবের আড়ালে রাষ্ট্রবিরোধী কোন কর্মকান্ড সংগঠিত কেউ করছে কিনা তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে যেই জড়িত থাকবে, রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। বিশ্বকে দেখাতে হবে আমরা গুজবে কান দেওয়া জাতি নয়, আমরা হচ্ছে মানব কল্যাণে অগ্রগামী সৈনিক।